আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত জটিল কোনো রোগের চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে ছোটেন। কিন্তু এবার ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো এবং এক অবিশ্বাস্য ঘটনা! ভারতের নামী হাসপাতাল যে জটিল অস্ত্রোপচার করতে দু-দুবার ব্যর্থ হয়েছিল, সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের চিকিৎসকরা। বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবায় বাংলাদেশের সাফল্য এখন আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে ‘মেডিকেল ভিসা’ নিয়ে বাংলাদেশে এসে এক বিদেশি তরুণী ফিরে পেয়েছেন তার সুন্দর স্বাভাবিক জীবন ও মুখের সৌন্দর্য। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি দেশের স্বাস্থ্য খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ক্যানসার জয় করলেও হারিয়েছিলেন নাক
ভুটানের ২৩ বছর বয়সী কলেজছাত্রী কারমা দেমা। জীবনটা যখন চমৎকারভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই তার শরীরে বাসা বাঁধে এক মরণব্যাধি নাক গহ্বরের ক্যানসার। চিকিৎসার জন্য তিনি ভর্তি হন ভারতের অত্যন্ত বিখ্যাত টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে।
সেখানের চিকিৎসকদের আন্তরিক চেষ্টায় কারমা দেমা ক্যানসারমুক্ত হন ঠিকই, কিন্তু ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য দেওয়া রেডিওথেরাপির এক ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তার শরীরে। রেডিওথেরাপির প্রভাবে ধীরে ধীরে তার নাকে পচন ধরে এবং একপর্যায়ে তার নাকটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
ভারতের ব্যর্থতা ও বাংলাদেশের স্বপ্ন
নাক হারিয়ে তরুণী কারমা দেমা যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন, তখন ভারতের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার নাকটি আবার আগের মতো তৈরি করার উদ্যোগ নেন। তারা দুই দফায় বড় ধরনের অপারেশন বা প্লাস্টিক সার্জারি করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ভারতের সেই নামী হাসপাতাল দুইবার চেষ্টা করেও কারমার নাক পুনর্গঠনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
ভারত যখন আশা ছেড়ে দেয়, তখন আশার আলো দেখায় বাংলাদেশ। কারমা দেমা এবং তার পরিবার জানতে পারেন বাংলাদেশের প্লাস্টিক সার্জারির উন্নত চিকিৎসার কথা। এর পরেই ইতিহাস তৈরি হয়। ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর, প্রথম স্বীকৃত বিদেশি রোগী হিসেবে অফিসিয়াল ‘মেডিকেল ভিসা’ নিয়ে বাংলাদেশে আসেন ভুটানের এই কন্যা।
৮ ঘণ্টার জটিল অপারেশন এবং অলৌকিক সাফল্য
বাংলাদেশে আসার পর কারমা দেমাকে ভর্তি করা হয় ঢাকার বিশ্বমানের চিকিৎসা কেন্দ্র ‘জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’-এ। এখানকার অভিজ্ঞ ও দক্ষ চিকিৎসকরা কারমার কেসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন।
এরপর বাঙালি চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল টানা ৮ ঘণ্টার এক অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল ‘মাইক্রোসার্জারি’ সম্পন্ন করেন। এই দীর্ঘ অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসকরা সফলভাবে কারমা দেমার নাকের পুনর্গঠন (Nose Reconstruction) করতে সক্ষম হন। অপারেশনটি এতটাই নিখুঁত ছিল যে কারমা দেমা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং তার মুখের আগের রূপ ফিরে পান। সফল চিকিৎসা শেষে তিনি অত্যন্ত হাসিমুখে এবং সুস্থ শরীরে নিজের দেশ ভুটানে ফিরে গেছেন।
দেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক
এই ঘটনাটি বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ, মেডিকেল ভিসায় সরকার স্বীকৃত কোনো বিদেশি রোগী বাংলাদেশে এসে জটিল চিকিৎসা করানোর ঘটনা এটাই প্রথম। এতদিন আমরা শুধু অন্য দেশে রোগী পাঠাতাম, আর এখন উন্নত দেশের বড় বড় হাসপাতাল যা পারছে না, আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা তা অনায়াসে করে দেখাচ্ছেন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক সুযোগ ও পরিবেশ পেলে বাংলাদেশের চিকিৎসকরা বিশ্বমঞ্চে যেকোনো দেশের চেয়ে সেরা চিকিৎসা দিতে সক্ষম।
কারমা দেমার এই সফল ফিরে আসা চিকিৎসা সেবায় বাংলাদেশের সাফল্য-এর এক জীবন্ত প্রমাণ। এর মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। এখন সময় এসেছে আমাদের নিজেদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখার। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসকদের আরও সুযোগ-সুবিধা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি দিলে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান ‘মেডিকেল হাব’ বা চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হতে পারবে।




