দুনিয়ার সব আবেগ, মোহ ও ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী। আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা ও তাঁর প্রিয় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি মুমিনের সুগভীর ও খাঁটি ভালোবাসা পরকালের চিরস্থায়ী কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। প্রতিটি ঈমানদার মুসলমানের অন্তরে একটাই আকাঙ্ক্ষা থাকে কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে এবং জান্নাতের আনন্দময় চিরস্থায়ী জীবনে যেন প্রিয় নবীজি (সা.)-এর পবিত্র সান্নিধ্য লাভ করা যায়।
আখিরাতে নবীজির সঙ্গী হওয়ার এই পরম সৌভাগ্য অর্জনের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসুল (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তাঁর সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ।
সাহাবিদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের হাদিস
সহিহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত এক ঐতিহাসিক হাদিস প্রতিটি মুমিনের অন্তরে আশার প্রদীপ প্রজ্বালিত করে। এই হাদিসটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভের সবচেয়ে বড় সুসংবাদ বহন করে।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামত কখন হবে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন সরাসরি সময় না বলে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?’
লোকটি অত্যন্ত বিনীতভাবে জবাব দিলেন, ‘আমি কিয়ামতের জন্য খুব বেশি নফল নামাজ, রোজা বা সদকা প্রস্তুত করতে পারিনি; তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে গভীরভাবে ভালোবাসি।’
এ কথা শোনার পর দয়ার নবী (সা.) পরম আশার বাণী শুনিয়ে বললেন,
أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ
অর্থ: ‘তুমি যাকে ভালোবেসেছ, (আখিরাতে) তুমি তার সঙ্গেই থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৩৯)
হজরত আনাস (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর চেয়ে অধিক আনন্দদায়ক ও হৃদয়স্পর্শী কথা সাহাবিদের জীবনে আর দ্বিতীয়টি ছিল না। কারণ তারা জানতেন, ভালোবাসার এই মহান শক্তিতেই জান্নাতে নবীজির পাশে থাকা সম্ভব।
ইবাদতের ঘাটতি থাকলেও ভালোবাসার শক্তি
সহিহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, এক সাহাবি রাসুল (সা.)-কে এমন এক মানুষকে ভালোবাসার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যার বাহ্যিক ইবাদত ও আমল সরাসরি রাসুল (সা.)-এর মতো উচ্চমানের নয়।
জবাবে প্রিয় নবী (সা.) পুনরায় নিশ্চিত করেন যে, মানুষ হাশরের মাঠে ও আখিরাতে তার প্রিয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই অবস্থান করবে। অর্থাৎ, কারো ইবাদতে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও যদি তার হৃদয়ে মহানবী (সা.)-এর প্রতি সত্য ও খাঁটি ভালোবাসা থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গ দান করবেন।
খাঁটি নবীপ্রেমের প্রকৃত অর্থ ও লক্ষণ
তবে এই আশার বাণীর অর্থ কখনোই এটা নয় যে, ইবাদত-বন্দেগি ছেড়ে দিতে হবে কিংবা দ্বীনি দায়িত্ব পালন থেকে উদাসীন থাকতে হবে। কেবল মুখে ভালোবাসার দাবি করলেই আসল ভালোবাসা প্রমাণিত হয় না।
প্রকৃত নবীপ্রেম মানুষের জীবনে যেসব পরিবর্তন আনে:
- সুন্নাহর অনুসরণ: সত্য ভালোবাসা মানুষকে প্রিয় নবীর সুন্নাহ ও চালচলন নিখুঁতভাবে মানতে উৎসাহিত করে।
- পাপ থেকে দূরত্ব: রাসুল (সা.) যেসব কাজ অপছন্দ করেছেন, সেগুলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা।
- সুন্দর চরিত্র গঠন: দৈনন্দিন ব্যবহারে, কথাবার্তায় এবং লেনদেনে মহানবী (সা.)-এর উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটানো।
- ইসলামের হুকুম মানা: ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত কাজগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করা।
যে ভালোবাসা মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও আচরণের মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান আদর্শ ফিরিয়ে আনে, তা-ই মূলত খাঁটি ভালোবাসা। আর এই খাঁটি ভালোবাসার প্রতিদানই হলো জান্নাতুল ফেরদৌসে নবীজির পবিত্র সান্নিধ্য।
বর্তমান যুগে রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভের উপায়
আজকের দুনিয়ায় চারদিকে নানা বিভ্রান্তি ও মোহের ভিড়। এই ব্যস্ত ও জটিল সময়ে নবীজির আদর্শকে আঁকড়ে ধরাই হলো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
নবীজির সান্নিধ্য পেতে আমাদের করণীয়:
- নবীজির সুন্নাহ চর্চা করা: খাওয়া, ঘুম, পোশাক থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রিয় নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ করা।
- বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা: রাসুল (সা.)-এর ওপর প্রতিদিন বেশি পরিমাণে দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা।
- নবীজির সিরাত বা জীবনী পড়া: রাসুল (সা.)-এর পবিত্র জীবনী ও হাদিস চর্চা করা, যেন তাঁর প্রতি মহব্বত আরও বৃদ্ধি পায়।
- উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া: মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা, আমানতদারিতা রক্ষা করা এবং সত্য কথা বলা।
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে পড়ে পরকালকে ভুলে যাওয়া চরম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। আখিরাতে সফলতা ও জান্নাতে প্রিয় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিবেশী হওয়ার একমাত্র পাথেয় হলো হৃদয়ে তাঁর প্রতি অনুগত ভালোবাসা রাখা এবং বাস্তব জীবনে তাঁর পবিত্র সুন্নাহ পালন করা। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মেনে চলার এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফায়াত ও শুভ সান্নিধ্য লাভের তৌফিক দান করুন। আমিন।




