পার্থিব জীবনে চলার পথে নানা ধরণের বাধা ও প্রতিকূলতা আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে অলসতা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং ঋণের বোঝা মানুষকে ভেতর থেকে একেবারে ভেঙে দেয়। এগুলো মানুষের কর্মক্ষমতা কেড়ে নেয়, জীবনকে থমকে দেয় এবং মানসিকভাবে পঙ্গু করে ফেলে।
একজন প্রজ্ঞাবান ও ধার্মিক মুমিনের কাছে ঋণের ভারের চেয়ে বড় কোনো মানসিক চাপ হতে পারে না। কারণ এটি সরাসরি বান্দার হকের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ক্ষমা পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর। এসব আত্মঘাতী মানসিক ও সামাজিক ব্যাধি থেকে বাঁচতে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে আশ্রয় চাওয়ার বিশেষ কিছু দোয়া শিখিয়ে গেছেন।
অলসতা ও ঋণের চাপ থেকে বাঁচার প্রথম দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) অলসতা, পাপাচার এবং ঋণের জটিলতা থেকে রেহাই পেতে নিয়মিত আল্লাহর কাছে আকুল আবেদন জানাতেন। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) এই ফরিয়াদটি নিয়মিত পেশ করতেন।
দোয়ার আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
- আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكَسَلِ، وَالْهَرَمِ، وَالْمَأْثَمِ، وَالْمَغْرَمِ
- উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল কাসালি, ওয়ালহারামি, ওয়ালমা’ছামি, ওয়ালমাগরামি।
- অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি অলসতা, চরম বার্ধক্য, গোনাহ এবং ঋণের বোঝা থেকে।” (সহিহ বুখারি: ২৩৯৭, সহিহ মুসলিম: ৫৮৯)
দোয়ার প্রতিটি শব্দের গভীর তাৎপর্য
- মিনাল কাসালি (مِنَ الْكَسَلِ): কোনো কাজ করার অনিচ্ছা, অলসতা বা দৈনন্দিন কর্মবিমুখতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
- ওয়াল হারামি (وَالْهَرَمِ): বার্ধক্যের এমন অসারতা ও জরাগ্রস্ততা, যা মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ও কাজ করার সক্ষমতা কেড়ে নেয়।
- ওয়াল মা’ছামি (وَالْمَأْثَمِ): যাবতীয় গোনাহ, পাপাচার ও মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকা।
- ওয়াল মাগরাম (وَالْمَغْرَمِ): ঋণের ভারী বোঝা, যা সময়মতো শোধ করতে না পেরে মানুষ সমাজে চরম লাঞ্ছিত ও বিপদে পড়ে।
দুশ্চিন্তা, ভীরুতা ও ঋণের বোঝা থেকে সার্বিক আশ্রয়
ঋণগ্রস্ত মানুষের ঈমান হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ ঋণের পাওনা মেটাতে গিয়ে মানুষ প্রায়ই মিথ্যা কথা বলতে এবং দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে বাধ্য হয়। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দূরদর্শী দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পাঠ করতেন।
সর্বাত্মক আশ্রয়ের অসাধারণ দোয়া
- আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
- উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আঝযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল ঝুবনি, ওয়া দালাআদ দাইনি, ওয়া গালাবাতির রিঝালি।
- অর্থ: “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার এবং মানুষের দমনপীড়ন থেকে।” (সহিহ বুখারি: ২৮৯৩)
ঋণ পরিশোধ ও পাওনাদারের প্রতি কৃতজ্ঞতার সুন্নাত
ইসলামে ঋণ গ্রহণ করলে তা যথাসময়ে সুদের ঝামেলামুক্তভাবে পরিশোধ করা এবং পাওনাদারের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্র ও আদর্শ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু রবিআ আল-মাখজুমি (রা.) একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেন। হুনাইনের যুদ্ধের সময় নবী করিম (সা.) তাঁর কাছ থেকে ৩০ বা ৪০ হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেকে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসার পর তিনি সম্পূর্ণ পাওনা মিটিয়ে দেন এবং তার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করে বলেন,
- আরবি: بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْحَمْدُ وَالأَدَاءُ
- উচ্চারণ: বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া আহলিকা ওয়া মালিকা, ইন্নামা ঝাযায়ুস সালাফিল হাম杜 ওয়াল আদায়ু।
- অর্থ: “আল্লাহ তাআলা তোমার পরিবার ও সম্পদে অফুরন্ত বরকত দান করুন। নিশ্চয়ই ঋণের উত্তম প্রতিদান হলো তা সুন্দরভাবে পরিশোধ করা এবং পাওনাদারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪২৪, মুসনাদে আহমাদ: ১৬৪১০)
বান্দার হক ও ঋণ মওকুফের অনন্য মর্যাদা
আল্লাহর কাছে মানুষের দেনা-পাওনা বা বান্দার হকের হিসাব অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত। যে ব্যক্তি অন্যকে ঋণ দিয়ে তা শোধ করার জন্য বাড়তি সময় দেয় কিংবা স্বেচ্ছায় কোনো অভাবীর ঋণ কিছুটা বা পুরোপুরি মাফ করে দেয়, পরকালে তার জন্য বিশাল প্রতিদান ও আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাওয়ার বিশেষ প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
স্বাবলম্বী হওয়া ও অলসতা পরিহারের উপায়
জীবনের সকল ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হওয়া, পরনির্ভরশীলতা ত্যাগ করা এবং অলসতা ঝেড়ে ফেলে কর্মঠ হওয়া একজন খাঁটি মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
যেসব বিষয় মেনে চলা প্রয়োজন
- নিয়মিত দোয়া পাঠ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা পাঠ করা।
- হালাল উপার্জনের চেষ্টা: অলস বসে না থেকে হালাল রুজি-রোজগারের জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রম চালানো।
- পরিকল্পিত জীবনযাপন: অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে সঞ্চয়ী হওয়া, যাতে ঋণ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি না হয়।
- পাওনাদারের সাথে সৎ ব্যবহার: ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা এবং পাওনাদারের সাথে সুন্দর আচরণ করা।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অলসতার অভিশাপ, মানসিক দুশ্চিন্তা এবং ঋণের কঠিন অপমানজনক বোঝা থেকে মুক্ত রেখে এক স্বাধীন, সম্মানিত, সমৃদ্ধ ও পবিত্র জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




