পর্যায়ক্রমে দেশের বন্ধ হয়ে থাকা সব পাটকল আবার চালুর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দ্রুত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ জুটমিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা এসব কারখানা চালু হলে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ার পাশাপাশি বিপুল মানুষের জীবিকার নতুন পথ উন্মুক্ত হবে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সরকারি এই মহতী উদ্যোগের ফলে দেশের শিল্প খাতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে এবং প্রায় ৫০ হাজার বেকার নাগরিক কাজের সুযোগ পাবেন।
১. ইতোমধ্যে সচল ৯টি পাটকলের চিত্র
ইতোমধ্যে ইজারা বা লিজ প্রক্রিয়ার আওতায় আনা ১৭টি মিলের মধ্যে ৯টি কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন কাজ শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
- চালু হওয়া এসব কারখানায় ইতোমধ্যেই প্রায় ৯,৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
- নতুন করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এমএম জুটমিল, রাঙ্গুনিয়ার কেএফডি লিমিটেড এবং নরসিংদীর পলাশের কো-অপারেটিভ জুটমিলকেও বেসরকারি ইজারার আওতায় আনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
অব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতেই মূলত সরকার এই লিজ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।
২. বড় শিল্প গ্রুপের বিশাল বিনিয়োগ ও ইজারা চুক্তি
বেসরকারি খাতের মাধ্যমে জুটমিলগুলো গতিশীল করতে দেশের সুপরিচিত দুটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে সম্প্রতি নতুন চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ (PRAN-RFL Group)
১. জাতীয় জুট মিলস (সিরাজগঞ্জ): সিরাজগঞ্জের এই কারখানায় প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ করা হবে। এটি চালু হলে ৫,২৩৮ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং এর বার্ষিক টার্নওভার দাঁড়াবে ৫০০ কোটি টাকায়।
২. স্টার জুট মিলস (খুলনা): খুলনার দিঘলিয়ায় অবস্থিত এই পাটকলে ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এখান থেকেও আরও ৫,২৩৮ জন মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
হ্যামকো গ্রুপ (Hamko Group)
- প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস (খুলনা): খুলনার খালিশপুরে অবস্থিত এই মিলটিতে ২১২ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে। এটি পুরোপুরি চালু হলে ১,১৫৩ জনের বেশি শ্রমিক কাজ পাবেন এবং বার্ষিক টার্নওভার হবে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।
এই চুক্তিগুলোর ফলে মোট ৬১৯ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ আসছে এবং ১১,৬২৯ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত হচ্ছে।
৩. অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন ও অন্যান্য মিলের আপডেট
খালি পড়ে থাকা কিছু কারখানাকে নতুন শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে:
- ঢাকার ডেমরায় থাকা করিম জুট মিলস ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসকে ‘বেজা’ (BEZA)-এর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে।
- সীতাকুণ্ডের প্রখ্যাত আমিন জুটমিলস ফেরত পাওয়া গেছে এবং ইজারাদার প্রতিষ্ঠান চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৪. পরিবেশবান্ধব পাটশিল্পে সরকারি উৎসাহ ও সাহায্য
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে তৎকালীন সরকার নানা লোকসানের কারণে বিজেএমসির ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে বর্তমান মেয়াদে অর্থনৈতিক গতি আনতেই পিপিপি (PPP) বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মডেলে স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে এগুলো লিজ দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক ও পলিথিন কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে সরকার যে উদ্যোগগুলো নিচ্ছে:
- ঋণ ও প্রণোদনা: পাটভিত্তিক নতুন শিল্পায়নে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি: বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পাটজাত পণ্যের প্রচার করা হচ্ছে।
- প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ: জুট ডাইভার্সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)-এর মাধ্যমে দেশি হস্তশিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও নানা মেলার আয়োজন করা হচ্ছে।
সরকারের এই সময়োপযোগী ও কার্যকরী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের বন্ধ থাকা পাটকলগুলো শুধু নতুন রূপই পাবে না, বরং দেশের হাজার হাজার বেকার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে এটি হতে যাচ্ছে অন্যতম বড় একটি বড় মাইলফলক।




