আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হলো নিজের বাসা। সারাদিনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি শেষে আমরা ফিরে আসি এই ভালোবাসার নীড়ে। কিন্তু একটু ভেবে দেখেছেন কি, যে বাসায় আপনি ও আপনার পরিবার রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন, সেই বাসাটি ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কতটা নিরাপদ? সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ছোট-বড় ভূমিকম্পের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ এবং সঠিক নির্মাণবিধি না মানার কারণে কাঠামোগত ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
ভূমিকম্পের শক্তিশালী ঝাঁকুনিতে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন মুহূর্তের মধ্যেই বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে। তাই আপনার প্রিয় বাসাটি ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। সহজ কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ দেখে আপনি শুরুতেই কাঠামোগত বা বাহ্যিক কিছু ঝুঁকির পূর্বাভাস পেতে পারেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে বুঝবেন আপনার বাসা ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলাতে প্রস্তুত কি না এবং সুরক্ষার জন্য ঠিক কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আপনার বাসা কি ভূমিকম্প সহনশীল? প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
চোখে দেখে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া না গেলেও কিছু প্রাথমিক সংকেত আপনাকে সচেতন করতে পারে। ভবনের দেওয়াল, বিম বা পিলারে অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন দেখলে অবহেলা করা একদম উচিত নয়।
১. দেওয়ালে বড় বা তির্যক ফাটল দেখা দেওয়া
বাসার দেওয়ালে হালকা বা ছোট ফাটল থাকা স্বাভাবিক, যা অনেক সময় প্লাস্টারের টানের কারণে হয়ে থাকে। তবে ফাটলটি যদি দেওয়ালের এক কোণ থেকে অন্য কোণে কোণাকুণি বা তির্যকভাবে ছড়াতে থাকে, তবে সতর্ক হওয়া উচিত। বিশেষ করে দরজা ও জানালার ফ্রেমের আশপাশে এমন বাঁকা বা তির্যক ফাটল দেখা দিলে এবং তা দিন দিন চওড়া হলে বুঝে নিতে হবে ভবনের কাঠামোতে কোনো ধরনের চাপ বা পরিবর্তন ঘটছে।
২. পিলার ও বিমে গভীর ফাটল এবং রড বেরিয়ে আসা
ভবনের মূল ভার বহন করে এর পিলার (Column) এবং বিম (Beam)। যদি পিলারে বা বিমে কোনো গভীর ফাটল দেখতে পান, কংক্রিট খসে পড়ে ভেতরের লোহার রড দেখা যায় কিংবা রডে মরিচা ধরে কাঠামোর ক্ষতি হতে থাকে, তবে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ। পিলারের সংযোগস্থলে কোনো আঘাত বা ফাটল থাকলে তা ভবনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এগুলো কখনোই সাধারণ মেরামতের মতো হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।
৩. নিচতলায় অতিরিক্ত খোলা জায়গা বা ‘সফট স্টোরি’
শহরাঞ্চলের অনেক ভবনের নিচতলা সম্পূর্ণ খালি রেখে পার্কিং, সুপারশপ বা দোকান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অথচ ওপরের তলাগুলোতে প্রচুর ইটের দেওয়াল ও ভারী আসবাবপত্র থাকে। প্রকৌশলের ভাষায় এই ধরনের ফাঁকা নিচতলাকে ‘সফট স্টোরি’ (Soft Storey) বলা হয়। ভূমিকম্পের সময় ভবনের ওপরের অংশের শক্তি নিচে এসে পড়ে। যদি নিচতলায় পর্যাপ্ত শক্ত পিলার বা শিয়ার ওয়াল না থাকে, তবে নিচতলাটি ধসে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে যায়।
৪. ভবন সামান্য হেলে পড়া বা মেঝের অস্বাভাবিক বিকৃতি
আপনার ভবনের আশপাশের অন্যান্য ভবনের সাথে তুলনা করে কিংবা মেঝের দিকে তাকালে যদি মনে হয় ভবনটি একদিকে হেলে পড়েছে, তবে এটি কাঠামোগত চরম দুর্বলতার স্পষ্ট প্রমাণ। এ ছাড়া ঘরের মেঝে অসম বা দেবে গেছে বলে মনে হলে বুঝবেন মাটির ধারণক্ষমতায় বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি দেখা মাত্রই কালবিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া দরকার।
৫. অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন ও অতিরিক্ত তলা নির্মাণ
অনেক মালিক ভবন নির্মাণের সময় রাজউক বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা মেনে চললেও পরবর্তীতে অনুমতি ছাড়াই ওপরের দিকে অতিরিক্ত তলা বা রুম তৈরি করেন। আবার অনেকে ভবনের ভেতরের ভার বহনকারী দেওয়াল বা পিলার কেটে স্থান বড় করেন। নকশা না মেনে বা পর্যাপ্ত শক্ত ভিত্তি (Foundation) ছাড়া ভবনে অতিরিক্ত বোঝা বাড়ালে ভূমিকম্পে তা অতি দ্রুত ধসে পড়তে পারে।
শুধু ফাটল দেখেই কি ভবনকে অনিরাপদ বলা সম্ভব?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, দেওয়ালে ফাটল থাকা মানেই কি ভবনটি ভূমিকম্পে ধসে পড়বে? উত্তর হলো—না। দেওয়ালে ফাটল থাকলেই যেমন ভবন পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ নাও হতে পারে, ঠিক তেমনি বাইরে থেকে দেখতে চকচকে ও ফাটলহীন ভবনও কাঠামোগতভাবে দুর্বল হতে পারে।
একটি ভবন প্রকৃতপক্ষে ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারবে কি না, তা বুঝতে নিচের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন:
- বিল্ডিং কোড বা নকশা অনুসরণ: ভবনটি নির্মাণের সময় ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (BNBC) সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
- নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান: ভালো মানের রড, সিমেন্ট, বালু ও কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে কি না এবং মিশ্রণের অনুপাত সঠিক ছিল কি না।
- মাটির গঠন ও পরীক্ষা (Soil Test): ভবনের নিচের মাটির ধারণক্ষমতা কেমন এবং মাটি পরীক্ষা করে সেই অনুযায়ী সঠিক গভীরতায় পাইলিং বা ফাউন্ডেশন করা হয়েছে কি না।
- প্রকৌশলগত ব্যবস্থাপনা: পিলারের পুরুত্ব, বিমের শক্তিশালী সংযোগ এবং শিয়ার ওয়ালের যথাযথ অবস্থান রয়েছে কি না।
- অতিরিক্ত কাঠামোগত চাপ: মূল নকশার বাইরে গিয়ে ভবনে কোনো অতিরিক্ত ওজন চাপানো হয়েছে কি না।
আপনার বাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সহজ উপায়
আপনি যদি জানতে চান আপনার বর্তমান বাসাটি ভূমিকম্পের হাত থেকে কতটা নিরাপদ, তবে নিচের প্রয়োজনীয় ধাপগুলো ধাপে ধাপে অনুসরণ করতে পারেন:
- নথি ও নকশা যাচাই করুন: বাসা কেনার সময় বা ভাড়া নেওয়ার আগে ভবনের অনুমোদিত নকশা, মাটি পরীক্ষার রিপোর্ট এবং কাঠামোগত নকশার (Structural Design) কপি সংগ্রহ করে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।
- বিল্ডিং কোড নিশ্চিত করুন: ভবনটির নকশা তৈরির সময়ে প্রযোজ্য বিএনবিসি (BNBC) কোড পুরোপুরি মেনে চলা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হয়ে নিন।
- পেশাদার কাঠামো প্রকৌশলী আনুন: প্রাথমিক লক্ষণে কোনো খটকা লাগলে একজন অভিজ্ঞ কাঠামোগত প্রকৌশলী (Structural Engineer) দিয়ে পুরো ভবন পরীক্ষা করান। প্রয়োজনে আল্ট্রাসনিক টেস্ট, স্কমিট হ্যামার টেস্ট বা রিবার স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে কংক্রিট ও ভেতরের রডের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে নিন।
- নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করুন: ভবনের দেওয়াল বা পিলারে নতুন কোনো ফাটল, নোনা ধরা বা পানির লিক দেখলে সাথে সাথে তা মেরামতের উদ্যোগ নিন।
ভূমিকম্পের সময়ে ও পরবর্তী জরুরি সতর্কতা
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্বিপাক আঘাত হানলে ভয় না পেয়ে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হবে। ভূমিকম্প শেষ হওয়ার পর কিছু জরুরি নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- নিরাপদে বের হয়ে আসুন: ঝাঁকুনি থামার পর যদি ভবনের পিলার, বিম বা দেওয়ালে বড় ধরনের নতুন ফাটল দেখা যায় অথবা ভবনটি হেলে পড়েছে বলে মনে হয়, তবে দ্রুত ও নিরাপদে বাসা থেকে খোলা জায়গায় বের হয়ে আসুন।
- ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ঢুকবেন না: বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দিয়ে ভবনটি পুরোপুরি নিরাপদ বলে ঘোষিত না হওয়া পর্যন্ত পুনরায় ঘরের ভেতর প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকুন।
- গ্যাস ও বিদ্যুতের ঝুঁকি এড়িয়ে চলুন: ভূমিকম্পের পর ঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে কোনো রকম আগুন জ্বালাবেন না বা বৈদ্যুতিক সুইচ অন-অফ করবেন না। মূল গ্যাস লাইন ও মেইন সুইচ বন্ধ করে জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন।
বিশেষজ্ঞের সঠিক মূল্যায়নই চূড়ান্ত সমাধান
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, পুরোনো ভবন মানেই বুঝি ঝুঁকিপূর্ণ আর নতুন ভবন মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ। আসল কথা হলো, একটি ভবনের স্থায়িত্ব ও ভূমিকম্প সহনশীলতা নির্ভর করে এর সঠিক নকশা, গুণগত নির্মাণসামগ্রী, সঠিক মাটি পরীক্ষা এবং নিয়মিত দেখভালের ওপর। ৫০ বছরের পুরোনো ভবনও যদি সঠিক প্রকৌশলগত নিয়মে তৈরি হয়, তবে তা নতুন অপরিকল্পিত ভবনের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হতে পারে।
তাই বাহ্যিক ফাটল বা লক্ষণ দেখে আতঙ্কিত না হয়ে সেগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করুন। আপনার প্রিয় পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে অভিজ্ঞ কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনের পেশাদার মূল্যায়ন করিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।




