পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত কত মানুষের কাছ থেকে কত রকমের প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা শুনি। কিন্তু মানুষের দেওয়া সেসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই শতভাগ নিশ্চিত নয়। পরিস্থিতি বা সময়ের প্রয়োজনে মানুষ তার কথা ভুলে যেতে পারে কিংবা ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে। কিন্তু এই মহাবিশ্বের যিনি একমাত্র মালিক, সেই মহান রবের প্রতিটি অঙ্গীকার বা ওয়াদা চিরসত্য, নির্ভুল এবং অব্যর্থ।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য এমন কিছু মহামূল্যবান ওয়াদা করেছেন, যা মানুষের হৃদয়ে নতুন করে আশা জাগায়, যেকোনো বিপদে বুক ভরা সাহস দেয় এবং জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ে আলোর দিশা দেখায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতিগুলোর ওপর মনে-প্রাণে বিশ্বাস রাখে এবং নিজের জীবনে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তার দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন হয়ে ওঠে সফল, শান্তিময় ও বরকতময়।
আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর সেই ৫টি মহান ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করব, যা একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের সবার জানা অত্যন্ত জরুরি।
কেন আল্লাহর ওয়াদা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য?
ইসলামে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অন্যতম একটি অংশ হলো তাঁর কথার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ইমরানের ৯ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।”
তাই একজন মানুষের জীবনে যখন সবদিক থেকে হতাশা চলে আসে, যখন চারপাশের সব চেনা মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনও আল্লাহর এই ওয়াদাগুলো মানুষের মনে বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। চলুন নিচে বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক সেই ৫টি ওয়াদা কী কী।
১. আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহও স্মরণ করবেন
এটি এমন এক পরম সৌভাগ্য এবং সম্মানের ঘোষণা, যা সাধারণ কোনো মানুষ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ যখন তার সৃষ্টিকর্তাকে মনে রাখে, তখন স্বয়ং বিশ্বজাহানের প্রতিপালক তাকে স্মরণ করেন।
আমরা যখন সুখে-দুঃখে তাসবিহ, তাহলিল, কুরআন তিলাওয়াত, নিয়মিত নামাজ আদায় কিংবা যেকোনো ভালো কাজের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করি, তখন মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমত, ক্ষমা, সাহায্য ও অনুগ্রহের মাধ্যমে আমাদের স্মরণ করেন।
পবিত্র কুরআনের সুরা আল-বাকারা-এর ১৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’
এই ওয়াদার গভীরতা বোঝাতে একটি বিখ্যাত হাদিসে কুদসি রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন ‘আমি আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সঙ্গে আচরণ করি, আর সে যখন আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সঙ্গে থাকি।’ (বুখারি ৭৪০৫, মুসলিম ২৬৭৫)। তাই আমরা যদি চাই আল্লাহ আমাদের সবসময় তাঁর রহমতের ছায়ায় রাখুন, তবে আমাদেরও প্রতিনিয়ত আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে।
২. তোমরা দোয়া করো, আমি কবুল করব
দোয়া হলো একজন মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। মানুষের জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন সব চেনা দরজা বন্ধ হয়ে যায়, চারপাশ থেকে শুধু অন্ধকার নেমে আসে। কিন্তু একজন বিশ্বাসী মানুষের জন্য আল্লাহর দরবারের দরজা সবসময় খোলা থাকে। তিনি তাঁর বান্দার চোখের পানি, মনের আকুতি এবং অত্যন্ত গোপনে বলা কথাগুলোও শোনেন।
অনেকে মনে করেন, দোয়া করার পরও কেন দ্রুত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা হলো তিনি ডাকলে অবশ্যই সাড়া দেবেন। আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য যা সবচেয়ে কল্যাণকর, ঠিক সময়ে সেটিই দান করেন।
পবিত্র কুরআনের সুরা গাফির (সুরা আল-মুমিন)-এর ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহর মহান ওয়াদা হলো:
‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’
দোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘দোয়াই হলো ইবাদত।’ (আবু দাউদ ১৪৭৯, তিরমিজি ২৯৬৯)। অর্থাৎ, আমরা যখনই আল্লাহর কাছে কিছু চাই, তখন শুধু আমাদের অভাবই পূরণ হয় না, বরং আল্লাহর দরবারে আমাদের ইবাদতের সওয়াবও লেখা হতে থাকে।
৩. শুকরিয়া আদায় করলে নেয়ামত ও রিজিক বৃদ্ধি পাবে
মানুষের একটি সহজাত স্বভাব হলো তার জীবনে যা নেই, সে তা নিয়ে বেশি চিন্তা ও আফসোস করে। অথচ যা আছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যায়। ইসলাম আমাদের শেখায় সবসময় আল্লাহর দেওয়া সকল নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া আদায় করতে।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে শুধু যে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায় তা নয়; বরং মানুষের ইমান, সুস্বাস্থ্য, সুন্দর পরিবার, সঠিক জ্ঞান এবং মনের শান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন, বান্দা যদি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়, তবে তিনি তার নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেবেন।
সুরা ইবরাহিম-এর ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’
এর পাশাপাশি ইসলাম আমাদের মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।’ (তিরমিজি ১৯৫৪)। তাই পরিবার, সমাজ বা বন্ধুদের যেকোনো ছোট উপকারে ধন্যবাদ দেওয়া এবং আল্লাহর দরবারে সবসময় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা আমাদের অভ্যাসে পরিণত করা উচিত।
৪. ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ওপর আল্লাহর শাস্তি আসে না
মানুষ হিসেবে আমাদের প্রতিনিয়ত ছোট-বড় কত ভুল বা গুনাহ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি চান তাঁর বান্দা ভুল করার পর যেন অহংকার না করে তাঁর কাছে ক্ষমা চায়। এই ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফার করার মধ্যে রয়েছে এক বিশাল অলৌকিক ক্ষমতা।
ইস্তিগফার শুধু আমাদের গুনাহ বা পাপই মাফ করে না, বরং এটি আমাদের জীবনের বড় বড় বিপদ-আপদ দূর করে দেয়, মনের ভেতরের অস্থিরতা দূর করে প্রশান্তি আনে এবং আকাশ থেকে রহমতের বৃষ্টি বা বরকতের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, যে সমাজ বা যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাদের ওপর আজাব বা শাস্তি দেন না।
পবিত্র কুরআনের সুরা আল-আনফাল-এর ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
‘তারা যখন ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না।’
নিয়মিত ইস্তিগফারের উপকারিতা নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি সুন্দর কথা বলেছেন ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার জন্য প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।’ (আবু دাউদ ১৫১৮)। অর্থাৎ, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়লে আল্লাহ নিজে সেই বিপদ থেকে বের হওয়ার রাস্তা তৈরি করে দেন।
৫. আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনিই যথেষ্ট
ইসলামে আল্লাহর ওপর ভরসা করার নাম হলো ‘তাওয়াক্কুল’। তবে তাওয়াক্কুল মানে এই নয় যে, আপনি কোনো কাজ না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন। সঠিক নিয়ম হলো আপনাকে আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা বা পরিশ্রম করতে হবে, তারপর সেই কাজের ফলাফলের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
যে মানুষটি তার জীবনের সব বিষয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখে, সে কখনো দুনিয়াতে একাকী বা অসহায় বোধ করে না। কারণ সে জানে, যা কিছু হচ্ছে সবই আল্লাহর হুকুমে এবং তার পেছনে কোনো না কোনো কল্যাণ লুকিয়ে আছে।
পবিত্র কুরআনের সুরা আত-তালাক-এর ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা চমৎকার একটি ওয়াদা করেছেন:
‘যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাওয়াক্কুলের একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বলেছেন ‘তোমরা যদি আল্লাহর উপর প্রকৃত তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে এমনভাবে রিজিক দিতেন যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন।’ (তিরমিজি ২৩৪৪)। পাখিরা যেমন সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে সন্ধ্যায় ভরা পেটে বাসায় ফেরে, মানুষের জীবনটাও ঠিক তেমনই বরকতময় হয়ে ওঠে যদি আল্লাহর ওপর খাঁটি ভরসা থাকে।
এক নজরে আল্লাহর ৫টি ওয়াদা ও আমাদের করণীয় (টেবিল)
আমাদের পাঠকদের সহজে বোঝার সুবিধার্থে নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো, যা আমাদের প্রতিদিনের জীবন পরিচালনায় সাহায্য করবে:
| আল্লাহর ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি | কুরআনের সুরা ও আয়াত | আমাদের প্রতিদিনের আমল |
| ১. আল্লাহ আমাদের স্মরণ করবেন | সুরা আল-বাকারা: ১৫২ | বেশি বেশি তাসবিহ, জিকির ও নামাজ আদায় করা। |
| ২. আমাদের দোয়া কবুল করবেন | সুরা গাফির: ৬০ | সুখে-দুঃখে সবসময় আল্লাহর কাছে মন খুলে চাওয়া। |
| ৩. নিয়ামত ও রিজিক বাড়িয়ে দেবেন | সুরা ইবরাহিম: ৭ | অল্পতে সন্তুষ্ট থেকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা। |
| ৪. জীবনে কোনো শাস্তি বা আজাব দেবেন না | সুরা আল-আনফাল: ৩৩ | প্রতিদিন নিয়ম করে বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়া। |
| ৫. সবকিছুর জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন | সুরা আত-তালাক: ৩ | নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করা। |
এই ওয়াদাগুলো কীভাবে আমাদের জীবনকে সুন্দর করে?
আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে দেখব এই ৫টি ওয়াদা আসলে একজন মানুষের মানসিক শান্তি ও সফল জীবনের মূল চাবিকাঠি।
- যখন আপনি জানবেন আল্লাহ আপনাকে স্মরণ করছেন, তখন আপনার মন থেকে একাকীত্ব দূর হয়ে যাবে।
- যখন জানবেন দোয়া কবুল হবে, তখন যেকোনো কঠিন রোগ বা সমস্যায় আপনি আশাবাদী থাকবেন।
- শুকরিয়ার মাধ্যমে আপনার মনের লোভ বা হিংসা দূর হবে।
- ইস্তিগফারের মাধ্যমে আপনার মন পবিত্র হবে এবং তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে আপনি ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাবেন।
আল্লাহ তাআলার এই পাঁচটি ওয়াদা প্রতিটি মুমিনের জন্য এক পরম উপহার। জীবনের সুখে-দুঃখে, অভাব-অনটনে, হাসিতে-কান্নায় আমরা যেন কখনো নিরাশ না হই। আল্লাহর এই চিরন্তন প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা রেখে আমরা যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি দিন সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই আমলগুলো করার তৌফিক দান করুন, আমিন।




