সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের সবারই থাকে। আর এর জন্য সুষম খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত হাঁটাচলা করার পরামর্শ চিকিৎসকরা সবসময়ই দিয়ে থাকেন। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক নতুন গবেষণায় দীর্ঘায়ু লাভ করার এক দারুণ ও সহজ উপায় সামনে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে মাত্র দুই ঘণ্টা ভার উত্তোলন (Weight Lifting) বা শরীরের শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করলেই দীর্ঘায়ু লাভের সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে চালানো এই গবেষণার ফলাফল বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ বছরের দীর্ঘ গবেষণা
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল অত্যন্ত বড় পরিসরে এই পরীক্ষাটি চালিয়েছেন। তারা প্রায় ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যায়ামের অভ্যাস এবং স্বাস্থ্যের ওপর নজর রাখেন।
গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যারা প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই ঘণ্টা ওজন উত্তোলন বা শরীরের শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করেছেন, তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি, যারা একদমই ব্যায়াম করেন না তাদের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম ছিল।
হৃদরোগ, স্ট্রোক ও স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি কমায়
এই শক্তিবর্ধক ব্যায়াম বা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং শুধু যে মানুষের আয়ু বাড়ায় তা নয়, এটি শরীরের মারাত্মক কিছু রোগ প্রতিরোধেও দারুণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী:
১. হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস
আজকাল অল্প বয়সেই অনেকের হৃদরোগ (Heart Disease) বা ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার খবর শোনা যায়। হার্ভার্ডের গবেষকরা জানিয়েছেন, যারা নিয়মিত সপ্তাহে দুই ঘণ্টা ভার উত্তোলন করেন, তাদের হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ১৯ শতাংশ কমে যায়।
২. স্নায়বিক রোগে অবিশ্বাস্য সুফল
গবেষণার সবচেয়ে বড় চমকপ্রদ তথ্যটি ছিল স্নায়বিক বা নিউরোলজিক্যাল রোগের ক্ষেত্রে। যারা নিয়মিত ওজন উত্তোলন বা রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডের (Resistance Band) মতো শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করেন, তাদের আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার মতো বিভিন্ন জটিল স্নায়বিক রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ২৭ শতাংশ কমে যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ড যেমন হাঁটা, দৌড়ানো বা সাইকেল চালানোর মতো অ্যারোবিক ব্যায়ামের প্রভাব বাদ দেওয়ার পরও শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের এই অবিশ্বাস্য ও ইতিবাচক ফলাফল বজায় ছিল।
দুই ঘণ্টার বেশি ব্যায়ামে বাড়তি কোনো লাভ নেই!
অনেকেই মনে করেন, যত বেশি ব্যায়াম করা যাবে শরীর তত বেশি ভালো থাকবে। কিন্তু এই গবেষণার ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, সপ্তাহে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করলেও মৃত্যুঝুঁকি আর নতুন করে কমে না। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যগত সর্বোচ্চ উপকার বা সুফল পেতে আপনাকে জিমনেসিয়ামে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা প্রতিদিন অতিরিক্ত সময় ব্যায়াম করার কোনো প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে মাত্র দুই ঘণ্টার মাঝারি মাত্রার রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিংই আপনার শরীরের জন্য একদম যথেষ্ট।
বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, শরীরকে শতভাগ ফিট রাখতে শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের পাশাপাশি কিছুটা অ্যারোবিক ব্যায়ামও (যেমন- হাঁটা বা দৌড়ানো) করা উচিত। এই দুটি ব্যায়ামের সমন্বয় হার্টের স্বাস্থ্য, পেশিশক্তি এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা উন্নত করতে সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
সুস্থ বার্ধক্যের জন্য শক্তিবর্ধক ব্যায়াম কেন জরুরি?
যুক্তরাজ্যের ‘স্পোর্ট ইংল্যান্ড’-এর স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নীতিবিষয়ক কৌশলগত প্রধান টম বার্টন এই গবেষণার ফলাফলকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সুস্থ ও সচল থাকা নিশ্চিত করার একটি চমৎকার এবং কার্যকর উপায় হলো এই শক্তিবর্ধক শারীরিক কার্যক্রম।
তিনি জানান, এ ধরনের ব্যায়াম বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগব্যাধি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এটি মানুষের বুড়ো বয়সেও নিজে নিজে চলাফেরার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখে এবং হসপিটাল বা চিকিৎসা সেবার ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা ও খরচ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই সক্রিয় ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন প্রতি বছর মানুষের প্রায় ৩৩ লাখ দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিশাল অংকের অর্থ সাশ্রয় করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: সপ্তাহে কতটুকু ব্যায়াম করবেন?
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থতার জন্য একটি সহজ গাইডলাইন দিয়েছে:
- সপ্তাহে অন্তত ২ দিন শরীরের প্রধান প্রধান পেশিগুলোকে সক্রিয় করে এমন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম বা ভার উত্তোলন করা উচিত।
- এর পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার (যেমন- দ্রুত হাঁটা) অথবা ৭৫ মিনিট উচ্চমাত্রার (যেমন- দৌড়ানো) শারীরিক ব্যায়াম করা প্রয়োজন।
ব্যস্ততম এই জীবনে নিজের জন্য সময় বের করা সত্যিই কঠিন। তবে আপনি যদি সপ্তাহে মাত্র দুই ঘণ্টা সময় নিজের পেশিশক্তি বাড়ানোর জন্য বা ভার উত্তোলনের পেছনে খরচ করতে পারেন, তবে তা আপনাকে একটি দীর্ঘ, রোগমুক্ত ও সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারে। তাই সুস্থ ও সুন্দরভাবে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে আজ থেকেই আপনার অলসতা দূর করুন এবং সপ্তাহে অন্তত দুই দিন হালকা ও মাঝারি ওজনের ভার উত্তোলনের অভ্যাস গড়ে তুলুন।




