মানুষ সামাজিক জীব। একা একা জীবনযাপন করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ে প্রতিটি মানুষেরই একজন ভালো বন্ধুর প্রয়োজন হয়। বন্ধু হলো মানুষের জীবনের আত্মিক আয়না। জীবনের প্রতিটি পদে বন্ধুর প্রভাব মানুষের চিন্তা-ভাবনা, স্বভাব-চরিত্র এমনকি পরকালের গন্তব্য পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিতে পারে।
এ কারণেই ইসলামে বন্ধু নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুনিয়ার সাময়িক স্বার্থ, দলীয় পরিচয় কিংবা মেকি আকর্ষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বরং কিয়ামতের কঠিন ময়দানে তা চরম আফসোস ও অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে সৎ ও সঠিক বন্ধু নির্বাচনের মূলনীতিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
১. সৎ ও পরহেজগার বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব
মানুষ স্বভাবগতভাবেই তার চারপাশের সঙ্গীদের আচার-আচরণ ও স্বভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়। আপনি যার সাথে চলাফেরা করবেন, ধীরে ধীরে তার ভালো কিংবা মন্দ গুণগুলো আপনার মাঝেও প্রকাশ পেতে শুরু করবে।
বন্ধু নির্বাচনের ব্যাপারে সতর্ক করে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
‘মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতি ও স্বভাব অনুসরণ করে। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (আবু দাউদ: ৪৮৩৩)
পবিত্র কুরআনেও প্রকৃত ঈমানদারদের মূল বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, তারা একে অপরের প্রকৃত সুহৃদ ও বন্ধু। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
‘আর ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করে। এদের ওপরই আল্লাহ অতিশীঘ্রই দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ৭১)
২. সৎসঙ্গ বনাম অসৎসঙ্গের বাস্তব উপমা
ভালো বন্ধু আর মন্দ সঙ্গীর প্রভাব বোঝাতে আমাদের প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত চমৎকার একটি বাস্তবসম্মত উপমা তুলে ধরেছেন।
হাদিস শরিফে এসেছে:
مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَكِيرِ الْحَدَّادِ، لَا يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا أْنَ تَشْتَرِيَهُ أَوْ تَجِدَ رِيحَهُ، وَكِيرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً
‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে তুমি হয়তো আতর কিনবে কিংবা সে তোমাকে উপহার দেবে, তা না হলেও অন্তত তার কাছ থেকে সুন্দর সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, নয়তো তার কাছ থেকে পাও বিষাক্ত দুর্গন্ধ।’ (সহিহ বুখারি: ৫১৩৬)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ভালো মানুষের সাথে থাকলে আপনি কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হবেনই। অন্যদিকে খারাপ মানুষের সঙ্গ আপনার জীবন ও চরিত্রকে ধ্বংস করে দেবে।
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা ও ঈমানের পূর্ণতা
কোনো স্বার্থ বা পার্থিব উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাউকে ভালোবাসা ঈমান পূর্ণতার অন্যতম শর্ত। যে বন্ধুত্বে কোনো পার্থিব চাওয়া-পাওয়া থাকে না, সেই বন্ধুত্বই জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছায়।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ করেন:
مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসল, আল্লাহর জন্যই কাউকে অপছন্দ করল, আল্লাহর জন্যই দান করল এবং আল্লাহর জন্যই দান করা থেকে বিরত থাকল সে তার ঈমানকে পূর্ণতা দান করল।’ (আবু দাউদ: ৪৬৮৩)
ইসলামি স্কলারদের মতে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাআলা নিজে তাদের ভালোবাসেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অন্য গ্রামে দ্বীনি ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাওয়া ব্যক্তির পথচলায় ফেরেশতা পাঠিয়ে আল্লাহ সুসংবাদ দেন:
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে ঠিক তেমনই ভালোবাসেন, যেমনটি তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অমুক ব্যক্তিকে ভালোবেসেছ।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৭)
৪. ভুল বন্ধু নির্বাচনের ভয়াবহ পরিণাম
শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বা অসৎ মানুষের প্ররোচনায় যারা দুনিয়াতে পাপাচারী মানুষকে বন্ধু বানাবে, কেয়ামতের দিন তাদের শেষ বিচারের মাঠে চরম আফসোস করতে হবে। কিন্তু সেদিন এই অনুশোচনা কোনো কাজে আসবে না।
পবিত্র কুরআনে কেয়ামতের দিনের সেই চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে:
يَا وَيْلَتَى لَيْتني لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا
‘হায়, আফসোস আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ২৮)
৫. ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে বন্ধু নির্বাচনের মানদণ্ড
বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও حجت الاسلام ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সৎ বন্ধু চেনার জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে একজন বন্ধুকে অবশ্যই নিচের গুণগুলোর অধিকারী হতে হবে:
- বুদ্ধিমত্তা: বুদ্ধিমান বন্ধু বিপদে সঠিক পরামর্শ দেয়, কিন্তু মূর্খ বন্ধু উপকার করতে গিয়েও ক্ষতি করে ফেলতে পারে।
- সৎ স্বভাব: যার মেজাজ ও স্বভাব সুন্দর এবং চরিত্র ভালো।
- পাপাচারমুক্ত: যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় পায় না এবং প্রকাশ্য পাপাচার বা গুনাহে লিপ্ত থাকে, সে কখনো বিশ্বস্ত বন্ধু হতে পারে না।
- বিদআত মুক্ত থাকা: যিনি দ্বীনের সঠিক বিধান মেনে চলেন এবং দ্বীনের নামে নতুন কোনো ভুল প্রথা অনুসরণ করেন না।
- দুনিয়ামুখী না হওয়া: যে অতিরিক্ত অর্থ ও পার্থিব বিলাসিতার প্রতি অন্ধ নয়, কারণ অতিরিক্ত দুনিয়াসক্ত মানুষের সঙ্গ মানুষকে আখেরাত ভুলিয়ে দেয়।
বন্ধুত্ব কেবল গল্প-গুজব কিংবা হাসিখুশির মাধ্যম নয়; বরং এটি আমাদের পরকালের নাজাত কিংবা ধ্বংসের অন্যতম নিয়ামক। একজন দ্বীনদার ও সৎ বন্ধু আপনাকে যেমন সঠিক পথ দেখাবে, তেমনি কোনো বিপদেও আপনার পাশে দাঁড়িয়ে দ্বীনের ওপর অবিচল থাকতে সাহায্য করবে।
অতএব, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে মুমিন ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক আলো পেয়ে সৎসঙ্গ বেছে নেওয়ার এবং নিজেদের জীবনকে সুন্দর করার তৌফিক দান করুন। আমিন।




