জানাজার নামাজের সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি
মানুষ মরণশীল। প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং এটি অনন্তকালের জীবনের শুরু। আমাদের কোনো আপনজন যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, তখন তার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় উপহার হলো “জানাজার নামাজ”।
এটি কেবল একটি প্রথা নয়; এটি একটি ফরজে কিফায়া ইবাদত এবং মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত বা ক্ষমার জন্য সম্মিলিত প্রার্থনা। আজকের এই গাইডে আমরা খুব সহজভাবে জানাজার নামাজের সঠিক নিয়ম, নিয়ত জানব, যাতে আপনি আত্মবিশ্বাসের সাথে এই মহৎ দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
জানাজার নামাজ নিয়ে কিছু জরুরি কথা
জানাজার নামাজে কোনো রুকু বা সিজদা নেই। এটি দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয় এবং এতে মোট ৪টি তাকবীর থাকে। এটি মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করার একটি মাধ্যম।
যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ আদায় থেকে শুরু করে দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে, সে দু’কিরাত পরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি জানাজার সঙ্গে থাকে, নামাজ পড়ে এবং দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, সে দু’কিরাত নেকি নিয়ে ফিরে আসে। আর প্রতিটি কিরাতের পরিমাণ হলো উহুদ পাহাড়ের সমান।” — (সহিহ বুখারি)
আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন—
“যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ পর্যন্ত উপস্থিত থাকে, তার জন্য এক কিরাত সওয়াব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি জানাজার সঙ্গে থেকে দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তার জন্য রয়েছে দুই কিরাত সওয়াব।”
সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই দুই কিরাতের পরিমাণ কতটুকু?
রাসূলুল্লাহ ﷺ উত্তরে বলেন— “এর পরিমাণ হলো দুটি বিশাল পাহাড়ের সমান।” — (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
জানাজার নামাজের নিয়ত
নিয়ত মানে হলো মনের ইচ্ছা। আরবিতে নিয়ত করা জরুরি নয়, আপনি মনে মনে বা বাংলায় এভাবে নিয়ত করতে পারেন:
জানাজার নামাজের পদ্ধতি (হানাফি মাযহাব)
জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম খুব সহজ। নিচে ৪টি তাকবীরের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে নিয়মটি তুলে ধরা হলো:
প্রথম তাকবীর (হাত বাঁধা ও ছানা পড়া)
ইমাম সাহেব যখন “আল্লাহু আকবার” বলে হাত বাঁধবেন, তখন মুক্তাদিরাও (পিছনের মুসল্লিরা) হাত তুলে তাকবীর বলে হাত বাঁধবেন। এরপর মনে মনে ‘ছানা’ পড়বেন।
বাংলা উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তা‘আলা জাদ্দুকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান, আপনারই জন্য সব প্রশংসা। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মহিমা সর্বোচ্চ, এবং আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।
দ্বিতীয় তাকবীর (দরুদ শরীফ পড়া)
দ্বিতীয়বার “আল্লাহু আকবার” বলার পর (হাত না উঠিয়ে) দরুদে ইব্রাহিম পড়তে হয়।
اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আ-লি ইব্রাহীম; ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
আল্লা-হুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আ-লি ইব্রাহীম; ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর শান্তি ও রহমত নাযিল করুন, যেমন আপনি ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর নাযিল করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর বরকত দান করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
তৃতীয় তাকবীর (মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া)
তৃতীয়বার “আল্লাহু আকবার” বলার পর মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে হয়। এটিই জানাজার মূল অংশ।
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা মহিলার জন্য দোয়া: আল্লাহুম্মািগফির লি হাইয়িনা ওয়া মায়্যিতিনা, ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা, ওয়া ছাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা, ওয়া জাকারিনা ওয়া উনছানা…
(যদি পুরো আরবি দোয়া মুখস্থ না থাকে, তবে মনে মনে প্রভুর কাছে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ও জান্নাত প্রার্থনা করুন। আল্লাহ মনের ভাষা বোঝেন।)
জানাজার নামাজের দোয়া ও ফজিলত জানতে ক্লিক করুনচতুর্থ তাকবীর ও সালাম
চতুর্থবার “আল্লাহু আকবার” বলার পর আর কোনো কিছু পড়তে হয় না। এরপর ইমাম সাহেব ডানে ও বামে সালাম ফেরাবেন, আপনিও তার অনুসরণ করে সালাম ফেরাবেন।
কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১.জানাজা নামাজে জুতা পায়ে রাখা যাবে কি?
যদি জুতা এবং যে স্থানে দাঁড়ানো হচ্ছে তা পবিত্র থাকে, তবে জুতা পায়ে নামাজ পড়া যাবে।
২.জানাজার নামাজে তাকবীর ছুটে গেলে করণীয় কী?
জানাজার নামাজে কেউ যদি দেরিতে পৌঁছে তাকবীর মিস করে ফেলে, তাহলে সে ইমামকে যে অবস্থায় পাবে, ঠিক সেই অবস্থাতেই নামাজে শরিক হবে। অর্থাৎ ইমাম যে তাকবীরে আছেন, সেখান থেকেই নামাজ শুরু করবে।
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন— “তোমরা ইমামের সঙ্গে যতটুকু নামাজ পাও, ততটুকু আদায় করো। আর যা ছুটে যায়, তা পরে পূরণ করে নাও।” -(সহিহ বুখারি, কিতাবুল আযান, হাদিস: ৬৩৫)
যদি জানাজার লাশ তখনও সেখানে উপস্থিত থাকে, তবে ইমাম সালাম ফেরানোর পর ছুটে যাওয়া তাকবীরগুলো আদায় করে নেবে। আর যদি আশঙ্কা থাকে যে লাশ দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে, তাহলে ফকিহদের মতানুসারে তার জন্য দুটি সুযোগ রয়েছে—
১. সে চাইলে বাকি তাকবীরগুলো পূরণ করতে পারে
২. অথবা ইমামের সঙ্গে সালাম ফিরিয়েও নামাজ শেষ করতে পারে
সবশেষে বলা যায়, এই ক্ষেত্রে শরিয়ত সহজতা প্রদান করেছে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
৩.মহিলারা কি জানাজার নামাজ পড়তে পারবেন?
এই বিষয়টা নিয়ে ইখতেলাফ আছে। অনেক ওলামাকেরাম বলেন পর্দার সাথে থেকে মহিলারাও জানাজার নামাজে অংশ নিতে পারেন, যদি পরিবেশ অনুকূল থাকে। তবে সাধারণত আমাদের দেশে মহিলারা জামাতে অংশ নেন না। কবরস্থানে যাওয়া তাদের জন্য মাকরূহ বলা হয়েছে।
৪.জানাজার নামাজে হাত উঠানোর বিধান কী?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী শুধু প্রথম তাকবীরে হাত উঠানো হয়। পরবর্তী তাকবীরগুলোতে হাত তোলা হয় না।
৫.জানাজার নামাজ কি একজন মৃতের জন্য দুইবার পড়া যায়?
সাধারণত একবার পড়াই সুন্নত। তবে কেউ যদি প্রথম জানাজায় অংশ নিতে না পারে, তাহলে তার জন্য পরে জানাজা পড়া জায়েজ।
৬.জানাজার নামাজের নিয়ম এবং দোয়া কী?
জানাজার নামাজে মোট ৪টি তাকবীর হয়:
1️⃣ ১ম তাকবীর: সানা
2️⃣ ২য় তাকবীর: দরুদ শরীফ
3️⃣ ৩য় তাকবীর: মৃতের জন্য দোয়া
4️⃣ ৪র্থ তাকবীর: সংক্ষিপ্ত দোয়া ও সালাম
৭.জানাজার নামাজের ইমামতি করার নিয়ত কী?
ইমাম মনে মনে নিয়ত করবে: “আমি এই মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ ইমাম হিসেবে আদায় করছি।”
৮.জানাজার নামাজে কী বক্তব্য পাঠ করা হয়?
জানাজার নামাজে কোনো খুতবা বা বক্তব্য নেই। এটি সম্পূর্ণ দোয়াভিত্তিক নামাজ।
৯.জানাজা শব্দের অর্থ কী?
“জানাজা” শব্দের অর্থ হলো মৃত ব্যক্তি বা লাশ।
১০.জানাজার নামাজের পর লাশ দেখা যাবে কি?
হ্যাঁ, জানাজার নামাজের পর লাশ দেখা বা মুখ দেখাতে কোনো নিষেধ নেই।
১১.জানাজার নামাজ পড়ার বিধান কী?
জানাজার নামাজ ফরজে কিফায়া। কিছু লোক আদায় করলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়।
১২.গায়েবানা জানাজার নিয়ম কী?
যে মৃত ব্যক্তি উপস্থিত নেই, তার জন্য জানাজার নিয়ম একই। শুধু লাশ ছাড়া জানাজা পড়া হয়।