বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতিহিংসামূলক শাসনের যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তার সবচেয়ে নির্মম শিকারদের একজন ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তা শুধু একজন বিরোধী নেত্রীর ওপর আঘাত ছিল না- এটি ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়ের ধারণার ওপর সরাসরি আক্রমণ।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকার সেনানিবাসের শহীদ মইনুল হক সড়কের বাসভবন থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে যেভাবে উচ্ছেদ করা হয়, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে বরাদ্দপ্রাপ্ত সেই বাড়িতে তিনি কোনো অবৈধ দখলদার ছিলেন না; ছিলেন সামরিক বিধি অনুযায়ী বৈধ বাসিন্দা। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে, অপমানজনক পরিস্থিতিতে তাঁকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। সেই দিন তাঁর কান্নাজড়িত কণ্ঠে উচ্চারিত ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’-এর অভিযোগ আজও ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
এরপর শুরু হয় মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়। দুর্নীতির নামে দায়ের করা মামলাগুলো, রাষ্ট্রদ্রোহ ও নাশকতার অভিযোগ, একের পর এক মানহানি মামলা- সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প, যার উদ্দেশ্য একটাই: খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ এবং দেশীয় বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন সত্ত্বেও এই বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২০১৮ সালে কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটে। গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ‘মানবিক বিবেচনায়’ শর্তসাপেক্ষে মুক্তি- এই শব্দবন্ধ বাস্তবে পরিণত হয়েছিল এক ধরনের গৃহবন্দিত্বে। চিকিৎসকদের স্পষ্ট মতামত উপেক্ষা করে তাঁকে দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এটি কেবল আইনি সংকীর্ণতা নয়; এটি ছিল মানবিকতার পরাজয়।
কারাগারে ‘স্লো পয়জনিং’-এর অভিযোগ রাজনীতিকে আরও অন্ধকার এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, রাষ্ট্র যদি এমন সন্দেহ জন্ম দিতে পারে- সেটিই শাসনব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি মুক্ত করে দেয় বহুদিনের বন্দিত্বে থাকা কণ্ঠগুলোকে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার মুক্তি ছিল প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির এক অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।
এই সব নিপীড়নের মাঝেও খালেদা জিয়া শুধু ভুক্তভোগী ছিলেন না- তিনি ছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক। নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন অবস্থান, বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে ভারসাম্য- এসবই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও শিক্ষা বিস্তারের যে ভিত্তি রচিত হয়েছিল, তা আজও বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশ হয়ে আছে।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়- রাষ্ট্র কি বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে দেখবে, নাকি গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে? তাঁর ওপর চালানো নিপীড়ন ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার উদাহরণ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী নন; তিনি এক সময়ের প্রতীক- যিনি আপসহীন থেকেছেন, নিপীড়নের মুখেও নত হননি। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক, ক্ষমতায় থেকে কারাগার- এই দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতিকে শিখিয়েছে, গণতন্ত্রের লড়াই কখনো ব্যক্তিগত নয়; এটি প্রজন্মের উত্তরাধিকার।