আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল এবং ঐতিহাসিক অর্জন অর্জিত হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে গৌরবজনকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেই তিনি বিশ্বমঞ্চে চমক দেখিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২ জুন) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ওই ভাষণে তিনি বৈশ্বিক শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার রক্ষা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সময়োপযোগী ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁর এই বক্তব্য বিশ্বনেতাদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
বিশ্বনেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ
ঐতিহাসিক এই ভাষণের শুরুতে ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সমস্ত সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সদস্য দেশগুলো যে আস্থা ও সমর্থন বাংলাদেশের ওপর দেখিয়েছে, তার কারণেই এই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বমঞ্চে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি এই দায়িত্ব অত্যন্ত বিনয় এবং সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধের সঙ্গে গ্রহণ করছেন।
এ সময় তিনি এই গৌরবময় পদের জন্য তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। একই সাথে তাঁর এই নির্বাচনি প্রচারণায় অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতা করার জন্য দেশের সর্বস্তরের জনগণ, তাঁর টিম এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শুভানুধ্যায়ীদের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভূয়সী প্রশংসা
বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমান তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকৌরিসেরও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কাকৌরিস অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক একটি নির্বাচনি প্রচার পরিচালনা করেছেন, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ভবিষ্যতের একটি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
জাতিসংঘ এখন কোন চ্যালেঞ্জের মুখে? খলিলুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে তুলে ধরেন যে, জাতিসংঘ বর্তমানে এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যখন বিশ্বব্যাপী বড় বড় সংকট দৃশ্যমান। জাতিসংঘ যখন তার নবম দশকে প্রবেশ করছে, ঠিক তখনই বিশ্বজুড়ে সংঘাত, চরম মানবিক সংকট, উন্নয়নগত স্থবিরতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে।
এই পরিস্থিতি জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিশ্ববাসীর কাছে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর পাশাপাশি চরম আর্থিক সংকটও জাতিসংঘের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। ড. খলিলুর রহমান অঙ্গীকার করেন যে, এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন।
খলিলুর রহমানের ৬ দফা কর্মপরিকল্পনার মূল ভাবনা
বিশ্বের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা দিয়েছেন, তার মূল ভিত্তিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. শান্তি ও নিরাপত্তা ইস্যুকে অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের দীর্ঘদিনের গৌরবময় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সাইপ্রাস থেকে সুদান পর্যন্ত বিভিন্ন বৈশ্বিক মিশনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে শান্তি বজায় রাখাই হবে প্রধান কাজ।
২. সমন্বিত শান্তিরক্ষা কাঠামো গঠন
সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের বেসামরিক জনগণের সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে আরও কার্যকর এবং সমন্বিত শান্তিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
৩. নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
জাতিসংঘের যেকোনো শান্তিরক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াজাত কার্যক্রমে নারীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি করার জন্য তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
৪. ২০৩০ এজেন্ডা ও এসডিজি বাস্তবায়ন
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৭ সালের আসন্ন এসডিজি সম্মেলনকে সামনে রেখে পিছিয়ে থাকা লক্ষ্যগুলো দ্রুত অর্জনে তিনি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন।
৫. আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার
এসডিজি অর্থায়ন সহজ করা, অনুন্নত দেশগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর আমূল সংস্কার করার বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
৬. স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টেকসই উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ‘দোহা কর্মসূচি’সহ অন্য সব বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি যেন দ্রুত এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখার কথা জানান নতুন এই ইউএনজিএ সভাপতি।
নিচে এক নজরে ড. খলিলুর রহমানের কর্মপরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যসমূহ দেওয়া হলো:
| কর্মপরিকল্পনার মূল ক্ষেত্র | প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য |
| বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা | সংঘাত প্রতিরোধ ও বেসামরিক মানুষের জানমালের সুরক্ষা। |
| এসডিজি বাস্তবায়ন | ২০২৭ সালের সম্মেলনকে সামনে রেখে পিছিয়ে থাকা লক্ষ্য পূরণ। |
| আর্থিক সংস্কার | অনুন্নত দেশের জন্য ঋণ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও সহজ অর্থায়ন। |
| নারীর ক্ষমতায়ন | আন্তর্জাতিক শান্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। |
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের এই অবস্থান বিশ্ব দরবারে আমাদের কূটনৈতিক ক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। ড. খলিলুর রহমানের এই ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে তা বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক উন্নয়নে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।




