আমাদের সমাজে মা-বাবার স্থান অত্যন্ত উঁচুতে। সন্তানের জন্য মা-বাবা হলেন এমন এক নিয়ামত, যা হারিয়ে গেলে আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক সন্তানই মা-বাবার ত্যাগের কথা ভুলে গিয়ে তাঁদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে। এমনকি অনেকে গায়ে হাত তোলার মতো জঘন্য অপরাধেও লিপ্ত হচ্ছে। একজন সচেতন মুসলিম ও দায়িত্বশীল সন্তান হিসেবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত? মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করলে দুনিয়া ও আখিরাতে কী পরিণতি হতে পারে, তা কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানা প্রতিটি মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মা-বাবার মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশ
ইসলামে মা-বাবার অধিকার ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নিজের ইবাদত করার নির্দেশের পরপরই মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করার হুকুম দিয়েছেন। এতেই বোঝা যায় আল্লাহর কাছে মা-বাবার সম্মান কতটা অপরিসীম।
সূরা বনী ইসরাঈলের ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
“তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাঁদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাঁদের ধমক দিয়ো না; বরং তাঁদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো।”
চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ তাআলা যেখানে মা-বাবার কোনো আচরণে বিরক্ত হয়ে সামান্য ‘উফ’ শব্দটুকু বলতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, সেখানে মা-বাবার সাথে গালাগালি করা, গায়ে হাত তোলা বা অমানবিক আচরণ করা কতটা ভয়াবহ অপরাধ হতে পারে!
মায়ের ওপর অত্যাচার বা ভাইয়ের সহিংসতা দেখলে ইসলামী বিধান কী?
সম্প্রতি একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন উঠে এসেছে যদি কোনো ভাই তার নিজের মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করে বা মারধর করতে উদ্যত হয়, তবে অন্য ভাই বা সন্তানের করণীয় কী?
এই বিষয়ে ঢাকা বিমানবন্দরের জামিয়া বাবুস সালামের সম্মানীয় মুফতি ও মুহাদ্দিস জাওয়াদ তাহের এক দ্ব্যর্থহীন সমাধান দিয়েছেন। তিনি জানান, মায়ের গায়ে হাত তোলা বা অত্যাচার করা চরম ধিক্কারজনক এবং জাহান্নামে যাওয়ার মতো এক জঘন্য কাজ। এমন পরিস্থিতিতে নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকা ইসলাম সমর্থন করে না।
অন্যায় দেখলে তা প্রতিহত করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো অন্যায় হতে দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগ করে) বাধা দেয়। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে যেন মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ করে) বাধা দেয়। আর যদি তাও সম্ভব না হয়, তবে যেন অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। আর এটি ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহীহ মুসলিম: ৪৯)
따라서 মা বা বাবাকে রক্ষা করতে হলে সন্তান হিসেবে আপনার কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া ওয়াজিব:
- সরাসরি বাধা দেওয়া: ভাই বা অন্য কেউ যখন মায়ের ওপর হামলা করতে বা খারাপ ব্যবহার করতে উদ্যত হবে, তাকে শারীরিকভাবে আটকে দেওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব (আবশ্যক)।
- সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা: পরিবারের মুরুব্বি, আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানান। অত্যাচারী সন্তানকে সামাজিকভাবে চাপে রাখুন।
- আল্লাহর আজাবের ভয় দেখানো: নির্জনে তাকে ডেকে মা-বাবার অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণাম এবং আখিরাতের শাস্তির কথা বুঝিয়ে বলুন।
- আইনের সাহায্য নেওয়া: সহিংসতা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং মায়ের জীবন বা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে, তবে তাকে পুলিশে দেওয়া বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ জায়েজ। কারণ, مظلوم (অত্যাচারিত মা)-কে রক্ষা করা জালেম সন্তানের ওপর দয়া করার চেয়ে অনেক বেশি অগ্রাধিকার পায়।
মা বাবার সাথে খারাপ ব্যবহারের ভয়ানক পরিণতি
মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহার করলে মানুষ শুধু আখিরাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং দুনিয়াতেও তার জীবনে নেমে আসে চরম অভিশাপ। হাদিসের আলোকে এর ভয়াবহ পরিণামগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. জান্নাত হারাম হয়ে যাওয়া
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, মা-বাবার অবাধ্য সন্তানের জন্য জান্নাত সম্পূর্ণ হারাম। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি, মা-বাবার অবাধ্য সন্তান এবং দাইউস।
২. জান্নাতের সুঘ্রাণ থেকেও বঞ্চিত হওয়া
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহারকারী সন্তান জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না যদিও সেই সুঘ্রাণ হাজার বছরের দূরত্বের পথ থেকেও পাওয়া যায়।
৩. দুনিয়াতেই নগদ শাস্তি প্রাপ্তি
সাধারণত অধিকাংশ গুনাহের শাস্তি আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের বিচারদিনের জন্য স্থগিত রাখেন। কিন্তু মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি আল্লাহ তাআলা পরকালের পাশাপাশি এই দুনিয়াতেই নগদে দিয়ে থাকেন।
জামে তিরমিযীর ২৫১১ নম্বর হাদিসে আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, অত্যাচার এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার (মা-বাবার অবাধ্যতা) চেয়ে আর এমন কোনো গুনাহ নেই, যার শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতেও দ্রুত দেন এবং আখিরাতেও জমা রাখেন।
মা-বাবার দোয়াই সন্তানের ভাগ্যের চাবিকাঠি
মা-বাবার মন জয় করতে পারলে যেমন দুনিয়া ও পরকালের সফলতা লাভ করা যায়, তেমনি তাঁদের অভিশাপ খেলে জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। সন্তান যত বড় আমলকারীই হোক না কেন, মা-বাবা অসন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়। তাই কোনো সন্তান যদি অতীতে না বুঝে মা-বাবার সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করে থাকে, তবে এখনই তাঁর পা ধরে মাফ চেয়ে নেওয়া উচিত। আর যদি মা-বাবা ইন্তেকাল করে থাকেন, তবে তাঁদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা ও দান-সদকা করা জরুরি।
মা-বাবা আমাদের জান্নাত, মা-বাবা আমাদের জাহান্নাম। তাঁদের সেবা করা, তাঁদের মুখে হাসি ফোটানো এবং যেকোনো মূল্যে তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। আপনার পরিবারে বা আশেপাশে মা-বাবার ওপর কোনো অন্যায়ের ঘটনা ঘটলে চুপ না থেকে সঠিক পদক্ষেপ নিন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মা-বাবার যথাযথ সম্মান ও সেবা করার তৌফিক দান করুন। আমিন।




