বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ মানুষকে সরাসরি যুক্ত করতে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে জাতীয় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন (MUN Alert)’, সংক্ষেপে ‘মুন অ্যালার্ট’।
একই সঙ্গে চালু করা হয়েছে ২৪ ঘণ্টা সচল একটি টোল-ফ্রি হেল্পলাইন নম্বর – ১৩২১৯, যেখানে যে কেউ নিখোঁজ শিশু সংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারবেন।
শিশু সুরক্ষায় বড় অগ্রগতি
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে দেশে নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত ও সমন্বিত একটি কাঠামো তৈরি হলো, যা আগে কখনো ছিল না।
আন্তর্জাতিক মডেলে তৈরি ‘মুন অ্যালার্ট’
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বহুল ব্যবহৃত ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ ব্যবস্থার আদলে বাংলাদেশে এই সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৬ সালে শিশু অ্যাম্বার হ্যাগারম্যান অপহরণের ঘটনার পর এই ধরনের সতর্কতা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে ইউরোপের ৩২টি দেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে এটি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া গেলে নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বাংলাদেশে চালু হচ্ছে ‘মুন অ্যালার্ট’।
কেন এত জরুরি এই উদ্যোগ?
সিআইডি জানায়, ২০২৪ সালে সিলেটে পাঁচ বছর বয়সী শিশু মুনতাহা আক্তারের মর্মান্তিক নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ড দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দেয় এবং একটি শক্তিশালী জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তোলে।
এই ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে একটি আধুনিক ও কার্যকর ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়।
যেভাবে কাজ করবে ‘মুন অ্যালার্ট’
কোনো শিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হওয়ার যৌক্তিক আশঙ্কা দেখা দিলে—
- সিআইডি যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করবে
- সতর্কবার্তাটি ছড়িয়ে দেওয়া হবে:
- অফিসিয়াল ওয়েব পোর্টাল
- মোবাইল অ্যাপ
- অনলাইন ও প্রিন্ট সংবাদমাধ্যম
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
- ডিজিটাল বিলবোর্ড
- প্রয়োজনে মোবাইল এসএমএস ও সেল ব্রডকাস্টিংয়ের মাধ্যমে
এর ফলে দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ দ্রুত তথ্য পেয়ে উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করতে পারবেন।
তবে পুরো প্রক্রিয়ায় শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে রক্ষা করা হবে।
কোথায় জানাবেন তথ্য?
নিখোঁজ শিশু সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য জানাতে যোগাযোগ করা যাবে:
- জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯
- সিআইডি মিসিং চিলড্রেন সেল: ০১৩২০০১৭০৬০
- টোল-ফ্রি হেল্পলাইন: ১৩২১৯
সতর্কবার্তা জারি বা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকবে সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেলের হাতে।
প্রয়োজনে শিশু পাচার বা সীমান্ত পার হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘ইয়েলো নোটিশ’ জারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় শক্ত ভিত
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে:
- যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা NCMEC
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা (ফেসবুক)
- জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম
- ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ’ টিম
সবাই মিলে বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য একটি আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো দাঁড় করাচ্ছে।
আশার নতুন আলো
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, ‘মুন অ্যালার্ট’ চালুর মাধ্যমে—
- নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের সময় কমে আসবে
- অপহরণ ও পাচার প্রতিরোধ সহজ হবে
- জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে
- শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে
শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার পথে এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক উদ্যোগ।




