রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোটের রায়ের প্রতি আস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই জাতীয় সনদে অবশেষে সই করতে আজ সোমবার সন্ধ্যা ছয়টায় দলটির শীর্ষ নেতারা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস-এর বাসভবন যমুনায় যাচ্ছেন।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন-এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আজ সন্ধ্যায় জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করবে। সোমবার দুপুর সোয়া একটার পর দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়।
গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট। সেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিরঙ্কুশভাবে জয়ী হয়, যা ‘না’ ভোটের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এই জনসমর্থনের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের পথ স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের রায় দেশের সংস্কার রাজনীতিকে একটি শক্ত সাংবিধানিক ভিত্তি দিয়েছে।
আন্দোলনের শক্তি থেকে সাংবিধানিক পথে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের গড়া দল এনসিপি শুরু থেকেই জুলাই সনদের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালায় দলটি।
গণভোটে জনগণের স্পষ্ট রায়ের পর এনসিপির জুলাই জাতীয় সনদে সই করার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক মোড় ও ঐকমত্যের বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিনিধিদলে যারা থাকছেন
এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ সন্ধ্যার প্রতিনিধিদলে আরও থাকবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা- সারোয়ার তুষার, মনিরা শারমিন, জাবেদ রাসিন ও জহিরুল ইসলাম মূসা। তারা সবাই দলীয় অবস্থান ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে সনদে স্বাক্ষর করবেন।
সংস্কার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ যাত্রা
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকার করে এবং সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসনসহ একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করে।
প্রথম ধাপে গঠিত ছয়টি কমিশনের সুপারিশ থেকে ১৬৬টি প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
জুলাই জাতীয় সনদ: ঐকমত্যের দলিল
দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়, যা নিয়ে তৈরি হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত এবং ১৯টি মৌলিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত।
এই সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর ওপরই অনুষ্ঠিত হয় গণভোট, যেখানে জনগণ সরাসরি সংস্কারের পক্ষে রায় দেয়।
গণভোটের রায়ের প্রতিফলন
গত ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন। এই আদেশের অধীনেই ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক গণভোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির আজকের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে- গণভোটের রায়ই এখন রাজনৈতিক ঐকমত্যের কেন্দ্রবিন্দু। এটি রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী করবে।





