জীবন সবসময় এক নিয়মে চলে না। সময়ের আবর্তে কখনো যেমন প্রাচুর্যের সুদিন আসে, তেমনি মাঝেমধ্যে অভাব-অনটন ও আর্থিক টানাফোড়েন আমাদের জীবনকে ঘিরে ধরে। সংসারের দৈনন্দিন অপূর্ণ চাহিদা, ঋণের চাপ কিংবা আকস্মিক কাজ হারানোর ভয় মানুষের মানসিক শক্তিকে চুড়মার করে দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হতাশায় ডুবে যান এবং নিজের সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে অভাব কেবল কোনো আর্থিক কষ্ট নয়, এটি পরীক্ষা এবং আল্লাহর আরও কাছাকাছি যাওয়ার অনন্য সুযোগ।
সংকটকালে ইমান রক্ষা করে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন, তা জানতে ইসলামে বর্ণিত অভাবের সময় মুমিনের করণীয় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সহজ ভাষায় নিচে আলোচনা করা হলো।
১. অভাবকে আল্লাহর পরীক্ষা মনে করে ধৈর্য ধারণ
কঠিন সময়ে মনে করা যাবে না যে আল্লাহ আপনাকে ভুলে গেছেন বা অসন্তুষ্ট হয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, মুমিনের জীবনের সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থাই পরম কল্যাণকর। সুখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং কষ্টে ধৈর্য (সবর) ধরা মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য (মুসলিম: ২৯৯৯)। বিপদ হলো নিজের ইমানি শক্তিকে ঝালিয়ে নেওয়ার সময়।
২. সংকটেও হালাল উপার্জনে অবিচল থাকা
অভাবের সুযোগ নিয়ে শয়তান সুদের লেনদেন, ঘুষ, চুরি বা প্রতারণার মাধ্যমে দ্রুত টাকা আয়ের পথকে সুন্দর করে উপস্থাপন করে। কিন্তু অভাব কোনো অবস্থাতেই হারামকে হালাল করার অজুহাত হতে পারে না। সুরা আত-তালাকে আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে (তাফা অবলম্বন করে), আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং ধারণাতীত উৎস থেকে রিজিক দান করেন।
৩. রিজিকের মূল মালিক আল্লাহ এই বিশ্বাসে অটল থাকা
চাকরি, ব্যবসা বা কোনো বড় কর্তা আমাদের রিজিকদাতা নন; এগুলো কেবল বাহ্যিক মাধ্যম। প্রকৃত রিজিকের সর্বময় ক্ষমতার মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। কুরআনে এসেছে:
‘আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়।’ (সুরা হুদ: ৬)
এই অটল বিশ্বাস মনে রাখলে চাকরি বা ব্যবসার সংকটে মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে না।
৪. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়া করা
অভাবের দিনে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে না ঘুরে সবার আগে মহান আল্লাহর কাছে হাত তোলা উচিত। খাঁটি তওবা ও নিয়মিত ‘ইস্তিগফার’ (ক্ষমা প্রার্থনা) রুদ্ধ রিজিকের দুয়ার খুলে দেয়। সুরা নুহে (আয়াত: ১০-১২) বলা হয়েছে, ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে সমৃদ্ধ করেন।
৫. বিদ্যমান নিয়ামতের ওপর সন্তুষ্ট থাকা
অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে আমরা অর্জিত শত শত নিয়ামতের কথা ভুলে যাই। ব্যাংকে টাকা কম থাকলেও একটি সুস্থ শরীর, নিরাপদে থাকার ঘর কিংবা পরিবারের ভালোবাসা অনেক বড় ধন। আল্লাহ বলেন তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে তা শেষ করতে পারবে না। যা আছে তার ওপর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে মনে প্রশান্তি আসে।
৬. সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সাথে তুলনা বন্ধ করা
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অন্যের ভালো বাড়ি, নতুন গাড়ি বা বিলাসী জীবন দেখে নিজের সাধারণ জীবনকে তুচ্ছ ভাবাই মানসিক অশান্তির বড় কারণ। মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন:
“তোমরা সবসময় তোমাদের চেয়ে নিচের অবস্থানের মানুষদের দিকে তাকাও, ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকাবে না। এতে আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে করার কু-মানসিকতা তৈরি হবে না।” (বুখারি: ৬৪৯০)
৭. নিজেকে হীনমন্য না ভাবা
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মান-সম্মান বা যোগ্যতা টাকার অঙ্কে মাপা হয় না। অর্থের প্রাচুর্য মানুষকে বড় করে না, বড় করে মনের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। সুরা আল-হুজুরাতে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। তাই কম আয়ের জন্য নিজেকে ছোট ভাববেন না।
৮. প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের সহায়তা নেওয়া
আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও চরম সংকট দেখা দিলে কোনো প্রকার অহংকার না রেখে আত্মীয়স্বজন বা সৎ মানুষের সাহায্য চাওয়া সম্পূর্ণরূপে বৈধ। যৌথ প্রচেষ্টায় অনেক বড় বিপদ কেটে যায়।
৯. টাকা না থাকলেও সৎকাজের মাধ্যমে সওয়াব অর্জন
দান-সদকা মানেই কেবল হাজার হাজার টাকা দেওয়া নয়। একজন অভাবগ্রস্ত মানুষকে শারীরিক পরিশ্রম দিয়ে সাহায্য করা, ভালো পরামর্শ দেওয়া কিংবা নিজের মুখ ও হাত থেকে অন্যকে নিরাপদে রাখা এগুলো সবই হাদিসের দৃষ্টিতে সদকা (বুখারি: ১৪৪৫)। অর্থমূল্য ছাড়া এই সওয়াবগুলো হাসিল করা বেশ সহজ।
১০. আল্লাহর অসীম রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া
অভাব যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তা কখনো স্থায়ী হয় না। রাতের অন্ধকার শেষে যেমন নতুন ভোরের উদয় হয়, তেমনি প্রতিটি কষ্টের পর স্বস্তি আসে। সুরা আল-ইনশিরাহে আল্লাহ দু-দুবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন:
‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা আল-ইনশিরাহ: ৫-৬)
অভাব কোনো অভিশাপ নয়, বরং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আত্মিক উন্নয়নের বড় একটি শিক্ষালয়। অভাবের সময় মুমিনের করণীয় হলো হালাল পথে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, নিয়মিত দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। সাময়িক এই কষ্টের দিনে ধৈর্য ধরতে পারলে দুনিয়ায় মিলবে স্বচ্ছলতা এবং আখিরাতে মিলবে চিরস্থায়ী জান্নাতের সফলতা!




