অভাব-অনটন মানুষের জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। কখনো সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়, কখনো ঋণের বোঝা চেপে বসে, আবার কখনো শত চেষ্টা করেও রিজিকে বরকত পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটান।
কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা প্রাচুর্য দান করেন, আবার কাউকে অভাবের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। তাই অভাবের সময় ধৈর্য ধারণ, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং তাঁর কাছে বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা উচিত। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত অভাব-অনটন ও রিজিকের বরকত লাভের কার্যকরী আমল ও দোয়াগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আল্লাহ রিজিক বাড়িয়ে দেন
অভাবের মধ্যেও আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ কৃতজ্ঞ বান্দার প্রতি তাঁর নেয়ামত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
‘আর যখন আপনাদের রব ঘোষণা করেছিলেন, আপনারা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই আপনাদের আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হন, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৭)
২. অভাব-অনটন ও অপমান থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) অভাব, স্বল্পতা, অপমান এবং জুলুম করা ও জুলুমের শিকার হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে নিয়মিত আশ্রয় চাইতেন। দোয়াটি হলো
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ، وَالْقِلَّةِ، وَالذِّلَّةِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়াজ জিল্লাতি, ওয়া আউজুবিকা মিন আন আজলিমা আও উজলামা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দারিদ্র্য, স্বল্পতা ও অপমান থেকে। আর আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই, কাউকে জুলুম করা থেকে এবং কারও দ্বারা অত্যাচারিত হওয়া থেকে।’ (আবু দাউদ ১৫৪৪)
৩. রিজিকের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনার দোয়া
পবিত্র কুরআনে হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীরা আল্লাহর কাছে আসমান থেকে খাবারপূর্ণ দস্তরখান অবতীর্ণ করার আবেদন করেছিলেন। সেই প্রার্থনায় রিজিকের জন্যও একটি সুন্দর দোয়া রয়েছে
اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِنْكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা রাব্বāna আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামায়ি, তাকুনু লানা ঈদাল লি-আউয়ালিনা ওয়া আখিরিনা ওয়া আয়াতাম মিনকা। ওয়ারযুকনা ওয়া আনতা খাইরুর রাজিকিন।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ একটি দস্তরখান অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদের রিজিক দান করুন। আপনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ১лай)
৪. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করা
অভাব-অনটন ও সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইস্তিগফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। পবিত্র কুরআনে হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا
‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন। আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন ও নদীনালা প্রবাহিত করবেন।’ (সুরা নূহ: আয়াত ১০–১২)
ইস্তিগফারের সহজ আমল:
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: ‘আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই তওবা করছি।’
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে
‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন, প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (আবু দাউদ ১৫১৮)
৫. হালাল রিজিকের জন্য বিশেষ দোয়া
প্রতিদিন আল্লাহর কাছে এই সুন্দর দোয়াটি পড়ার মাধ্যমে হালাল উপার্জনে বরকত ও পরমুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্তি প্রার্থনা করা যেতে পারে
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত রাখুন।’ (তিরমিজি ৩৫৬৩)
অভাব-অনটন জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরীক্ষা। তাই অভাবের কারণে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না, বরং নিয়মিত নামাজ আদায় করতে হবে, বেশি বেশি ইস্তিগফার করতে হবে এবং হালাল উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার অভাব-অনটন দূর করুন, ঋণমুক্ত জীবন দান করুন এবং হালাল রিজিকে বরকত দান করুন। আমিন।




