শুক্রবার, মার্চ ১৩, ২০২৬

পবিত্র শবে কদরের মহিমা ও তাৎপর্য: মুমিন মুসলমানের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার

বহুল পঠিত

উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত ও বরকতময় রাত হলো শবে কদর। এটি এমন এক মহিমান্বিত রজনি, যার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর অশেষ রহমত ও শান্তিতে পরিপূর্ণ। এই পবিত্র রাতেই মানবজাতির হিদায়াতের আলোকবর্তিকা ‘পবিত্র কুরআন’ নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন “নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি কদরের রাতে।” (সূরা আল-কদর, আয়াত: ১)।

শবে কদর শব্দের অর্থ ও পরিচয়

‘শবে কদর’ শব্দটি ফারসি ও আরবি ভাষার একটি চমৎকার সংমিশ্রণ। ফারসি শব্দ ‘শব’ এর অর্থ হলো রাত এবং আরবি ‘কদর’ অর্থ হলো মর্যাদা, সম্মান বা ভাগ্য। সুতরাং শবে কদর মানে হলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বা মহিমান্বিত রাত। পবিত্র কুরআনের ভাষায় একে বলা হয় ‘লাইলাতুল কদর’।

কেন এই রাত হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ?

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই রাতের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে ‘আল-কদর’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল করেছেন। সেখানে তিনি পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন “কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” (সূরা আল-কদর, আয়াত: ৩)।

এর অর্থ হলো, একজন মুমিন যদি এই এক রাতে ইবাদত করেন, তবে তিনি ১০০০ মাস (প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস) একটানা ইবাদত করার চেয়েও বেশি সওয়াব লাভ করবেন। সাধারণ মানুষের গড় আয়ু যেহেতু এখন খুব বেশি নয়, তাই আল্লাহর রহমতে এই এক রাতের ইবাদত আমাদের সারা জীবনের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

শবে কদরের গুরুত্ব ও ফজিলত

বিশেষত্ববর্ণনা ও রেফারেন্স
কুরআন নাজিলএই রাতেই লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে কুরআন অবতীর্ণ হয়।
ফেরেশতাদের আগমনজিবরাঈল (আ.)-সহ অসংখ্য ফেরেশতা এই রাতে পৃথিবীতে নেমে আসেন।
গুনাহ মাফইমানের সাথে ইবাদত করলে পূর্বের সব পাপ ক্ষমা করা হয়। (বুখারি: ১৯০১)
শান্তি ও নিরাপত্তাসন্ধ্যা থেকে ফজর পর্যন্ত চারদিকে আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হয়।

শবে কদর অন্বেষণের সময় ও সঠিক তারিখ

শবে কদর ঠিক কোন রাতে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের সন্ধান করো।” (বুখারি শরিফ)।

অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের দিবাগত রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়িন এবং ওলামায়ে কেরামের মতে ২৭ রমজানের রাতটিই (২৬ রমজান দিবাগত রাত) পবিত্র শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই ঐতিহ্যের ভিত্তিতেই মুসলিম বিশ্বে এই রাতে বিশেষ গুরুত্বের সাথে ইবাদত করা হয়।

শবে কদরের রাতে করণীয় আমল

এই মহিমান্বিত রজনীতে অলসতা না করে ইবাদতে মগ্ন হওয়া উচিত। আমলের তালিকায় আপনি নিচের বিষয়গুলো রাখতে পারেন:

  • নফল নামাজ: দীর্ঘ কিরাত ও ধীরস্থিরভাবে নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদ আদায় করা।
  • তওবা ও ইস্তিগফার: নিজের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে ক্ষমা চাওয়া।
  • কুরআন তেলাওয়াত: এই রাতে যেহেতু কুরআন নাজিল হয়েছে, তাই অধিক পরিমাণে কুরআন পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
  • দরুদ পাঠ: প্রিয় নবী (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা।
  • দান-সদকা: সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবী মানুষকে সাহায্য করা।
  • জিয়ারত: কবরস্থানে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা।

ইতিকাফ: আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফে বসতেন। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্যই হলো লাইলাতুল কদর তালাশ করা। যখন একজন বান্দা সবকিছু ছেড়ে মসজিদের কোণে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হন, তখন তার জন্য শবে কদরের বরকত লাভ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

শবে কদরের বিশেষ দোয়া

হজরত আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি জানতে পারি কোন রাতটি শবে কদর, তবে আমি কী দোয়া পড়ব?” রাসূল (সা.) তাকে এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন:


শবে কদর আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উপহার। এটি কেবল জেগে থাকার রাত নয়, বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির রাত। আমাদের উচিত দুনিয়াবি কাজ কমিয়ে দিয়ে এই রাতে বেশি বেশি তওবা ও ইবাদত করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শবে কদরের পূর্ণ বরকত নসিব করুন। আমিন।

আরো পড়ুন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের ইফতার মাহফিল ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলো ইফতার মাহফিল ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

দাকাতুল ফিতরের হার নির্ধারণ: জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা, সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা

চলতি বছরের সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা)-এর হার নির্ধারণ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এ বছর জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা ফিতরা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রমযানের প্রস্তুতি: আত্মিক ও শারীরিক প্রস্তুতির পূর্ণ গাইড

রমযান কেবল একটি মাস নয়, এটি হলো আত্মিক জাগরণের সময়। এই মাসে মানুষের হৃদয় আলোর প্রতিফলনে ভরে ওঠে, মন শান্ত হয় এবং আত্মা আল্লাহর দিকে ঝুঁকে।
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ