দেশের তরুণ ও মেধাবী উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেল। নতুন কোনো ব্যবসা বা স্টার্টআপ শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন যারা, তাদের আর্থিক অভাব দূর করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিভাগ থেকে এখন একজন উদ্যোক্তা তাঁর আইডিয়া বা প্রজেক্টের ওপর ভিত্তি করে সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহযোগিতা পাবেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই, ২০২৬) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের মেধাবী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে রাষ্ট্র পুরোপুরি প্রস্তুত।
৫০০ কোটি টাকার বিশেষ স্টার্টআপ ফান্ড
আইসিটি মন্ত্রণালয় দেশের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন নতুন উদ্ভাবন এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, সরকার তরুণদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশাল বাজেট বা স্টার্টআপ ফান্ড তৈরি করেছে। এই ফান্ডের মূল লক্ষ্যই হলো অর্থাভাবে যেন কোনো ভালো আইডিয়া বা ব্যবসা বন্ধ হয়ে না যায়। এই তহবিল থেকে যোগ্য উদ্যোক্তাদের সরাসরি ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ানো হবে।
কোনো জামানত বা ব্যাংকের ভোগান্তি ছাড়াই মিলবে টাকা
সাধারণত দেখা যায়, কোনো তরুণ যখন নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য ব্যাংকে ঋণের আবেদন করতে যান, তখন ব্যাংক থেকে মর্টগেজ বা জামানত হিসেবে বাবার জমি, বাড়ি কিংবা নানা রকম মূল্যবান সম্পত্তি দেখতে চাওয়া হয়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর বা তরুণের মাথায় দারুণ বিজনেস আইডিয়া থাকলেও এই জামানত বা কাগজের জটিলতার কারণে তারা ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ পান না।
তরুণদের এই প্রধান সমস্যাটি দূর করার জন্য সরকার একটি চমৎকার সমাধান নিয়ে এসেছে। এবার সরকারি ফান্ড পাওয়ার জন্য কোনো ব্যাংকের টেবিল চত্বরে ঘুরতে হবে না এবং কোনো জামানতও দিতে হবে না।
সরকার এই পুরো বিষয়টি দেখভালের জন্য সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি কমিটি গঠন করেছে। সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, এই কমিটিতে কোনো মন্ত্রী বা রাজনৈতিক উপদেষ্টারা নেই। এই নিরপেক্ষ কমিটির বিশেষজ্ঞরা সরাসরি উদ্যোক্তাদের বিজনেস প্রজেক্ট বা আইডিয়াটি খতিয়ে দেখবেন। যদি আপনার আইডিয়া বা প্রজেক্টের মধ্যে সত্যিকারের সম্ভাবনা থাকে, তবে এই কমিটিই আপনার ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করে দেবে।
ব্যবসায় লস হলে বা শুরুতে ভালো না করলে কী হবে?
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক প্রশ্নের জবাবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এই ফান্ডিংয়ের টাকাটি জনসাধারণের টাকা (Public Money), তাই এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে ব্যবসা করতে গেলে যে শুরুতে কিছুটা ক্ষতি বা উত্থান-পতন হতে পারে, সেটিও সরকার বিবেচনা করছে।
অনেক সময় দেখা যায়, একটি নতুন ব্যবসা শুরুতেই খুব ভালো পারফর্ম করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে যদি ওই প্রজেক্ট বা ব্যবসার মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বা পোটেনশিয়াল থাকে, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সরকার ওই উদ্যোক্তাকে দ্বিতীয়বার বা আবারও ফান্ডের সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা করবে, যেন তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে সফল হতে পারেন।
‘জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’ কী এবং এটি কীভাবে কাজ করবে?
উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা যেন এক ছাদের নিচেই পাওয়া যায়, সে জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এই জাতীয় প্ল্যাটফর্মটি তরুণদের জন্য একটি ‘লঞ্চপ্যাড’ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তা নিচের সুবিধাগুলো একদম সহজেই এক জায়গা থেকে পাবেন:
- সরকারি সহায়তা কর্মসূচি: সরকার স্টার্টআপদের জন্য কী কী সুবিধা দিচ্ছে, তা জানা যাবে।
- সহজ আবেদন প্রক্রিয়া: ফান্ডের জন্য ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদনের নিয়ম ও ফর্ম পাওয়া যাবে।
- প্রশিক্ষণ ও মেন্টরিং: ব্যবসা কীভাবে বড় করতে হয় এবং সফলভাবে চালাতে হয়, তার জন্য অভিজ্ঞদের কাছ থেকে গাইডলাইন বা মেন্টরিংয়ের সুযোগ থাকবে।
- বিনিয়োগের সুযোগ: দেশি-বিদেশি বড় বড় বিনিয়োগকারী বা অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হওয়ার সরাসরি সুযোগ মিলবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম অনেক বেশি গতিশীল হবে এবং বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানের কিছু বিশেষ দিক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এই চমৎকার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান এবং সূচনা বক্তব্য রাখেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা। উদ্বোধনী পর্ব শেষ হওয়ার পর দুপুরের পর থেকে অনুষ্ঠানটি সাধারণ দর্শনার্থী ও তরুণদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যেখানে অনেকেই স্টার্টআপ নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর সরাসরি জানতে পেরেছেন।
তাই আপনার কাছে যদি নতুন কোনো আইডিয়া থাকে, তবে আজই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করুন। সরকারের এই ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড আপনার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।




