গত মঙ্গলবার বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে দলে সৃষ্টি হয়েছে এক গভীর শূন্যতা। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় শোক কাটিয়ে দেশ যখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে, তখন বিএনপির ভেতরে শুরু হয়েছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সমীকরণ। সামনে নতুন বছর এবং জাতীয় নির্বাচন- এমন বাস্তবতায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পূর্ণাঙ্গ ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
তবে দলের শীর্ষ নেতাদের এই অনুরোধে এখনই সায় দেননি তারেক রহমান। নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, মায়ের মৃত্যুশোক এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তিনি এখনই আনুষ্ঠানিক পদে আসীন হতে চাইছেন না। বরং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সরাসরি মতামতের ওপর ভিত্তি করেই তিনি এই বড় সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী।
কী ভাবছেন তারেক রহমান?
তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, তিনি গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ থাকলেও, তিনি ভারপ্রাপ্ত হিসেবেই আরও কিছুদিন কাজ চালিয়ে যেতে চান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য বলেন, ‘‘নেতারা চেয়েছিলেন রেজ্যুলেশন করে এখনই তাকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান ঘোষণা করতে। কিন্তু তারেক রহমান বিনয়ের সঙ্গে তা বারণ করেছেন। মায়ের শোক কাটিয়ে ওঠা এবং তৃণমূলের সেন্টিমেন্টকে প্রাধান্য দিতেই তার এই ধীরস্থির অবস্থান।’’
তারেক রহমানকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এমন দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, তিনি ‘চাপিয়ে দেওয়া’ নেতৃত্বের বদলে কাউন্সিল বা তৃণমূলের প্রত্যক্ষ সমর্থনে চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করাকে বেশি গণতান্ত্রিক ও সম্মানজনক মনে করছেন।
গঠনতন্ত্র কী বলছে?
বিএনপির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারেক রহমানের চেয়ারম্যান হওয়ার পথে কোনো আইনি বা সাংবিধানিক বাধা নেই।
- ধারা ৭-এর ‘গ’ (২): চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন।
- ধারা ৭-এর ‘গ’ (৩): যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে (যেমন মৃত্যুজনিত কারণ), সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। পরবর্তী কাউন্সিল ও নির্বাচিত চেয়ারম্যান দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত তিনি বহাল থাকবেন।
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্যের মতে, ‘‘বিষয়টি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘অটো’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে যাওয়ার কথা। এর জন্য কাউন্সিলের প্রয়োজন নেই। আমরা খুব শিগগিরই কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাস করব।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অবশ্য কৌশলী উত্তর দেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি এই মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’’
মা ও ছেলের রাজনৈতিক পথচলা: এক নজরে
বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান—উভয়েই বিএনপির ক্রান্তিকালে দলের হাল ধরেছেন।
- বেগম খালেদা জিয়া: ১৯৮৩ সালের মার্চে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক।
- তারেক রহমান: ১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে যাত্রা শুরু। ১৯৯১-এর নির্বাচনে মায়ের সফরসঙ্গী হিসেবে সারা দেশ চষে বেড়ান। ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন।
বিশেষত, দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান দলের কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ২০১৮ সালে বেগম জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী’ যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেবেন, তা দলীয় ফোরামে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই জানা যাবে।’’
আপাতত দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দৃষ্টি এখন গুলশান কার্যালয় ও লন্ডনের (তারেক রহমানের পূর্বের অবস্থান) পরবর্তী নির্দেশনার দিকে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে তারেক রহমান কবে আনুষ্ঠানিক হাল ধরবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: যায় যায় দিন