দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে তাদের ব্যবসায়ে সহায়তা করার জন্য বিশেষ একটি অর্থায়ন কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে।
এ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নির্বাচিত প্রত্যেক তরুণ উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করা হবে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই ২০ লাখ টাকার অর্ধেক (১০ লাখ টাকা) থাকবে ব্যাংক ঋণ এবং বাকি অর্ধেক (১০ লাখ টাকা) থাকবে সম্পূর্ণ অনুদান।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির নানা দিক বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট’-এর উদ্যোগে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
কীভাবে কাজ করবে এই অর্থায়ন কর্মসূচি?
অনেক সময় দেখা যায়, গ্রামের বা উপজেলা পর্যায়ের অনেক তরুণের মাথায় দারুণ দারুণ ব্যবসায়িক বুদ্ধি থাকে। কিন্তু পুঁজি বা টাকার অভাবে তারা ব্যবসা শুরু করতে পারেন না। এই সমস্যার সমাধান করতেই মাঠে নামছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একদম উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে খোঁজখবর নেবে এবং সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করবে। এরপর আবেদনকারীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বা আইডিয়া এবং তার কত টাকা প্রয়োজন, তা যাচাই-বাছাই করে অর্থায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঋণের সুদের হার ও জামানত সংক্রান্ত তথ্য
সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে নানা রকমের জামানত বা বন্ধকী জমি দিতে হয়, যা নতুন তরুণদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশেষ স্কিমে তরুণদের জন্য রয়েছে বড় ছাড়।
- সুদের হার: গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণের জন্য সুদের বা মুনাফার হার রাখা হয়েছে খুবই কম, মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ।
- জামানত বা বন্ধক: এই ঋণ পাওয়ার জন্য কোনো প্রকার সহায়ক জামানতের প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ, জামানত ছাড়াই তরুণরা এ সুবিধা পাবেন।
একটি বিশেষ সতর্কতা
যদি কোনো উদ্যোক্তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে তার অনুদানের অংশটি আর অনুদান থাকবে না। সেটি তখন সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। পাশাপাশি তার নাম খেলাপি ঋণের তালিকায় চলে যাবে, যার ফলে ভবিষ্যতে তিনি আর কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা রাখবেন না।
কারা পাবেন এই ঋণ? আবেদনের যোগ্যতা ও শর্তাবলি
বাংলাদেশ ব্যাংক এই কর্মসূচির আওতায় আসার জন্য নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতা নির্ধারণ করে দিয়েছে:
১. বয়সের সীমা: আবেদনের শেষ তারিখে আবেদনকারীর বয়স হতে হবে সর্বোচ্চ ২৮ বছর (অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হতে হবে)।
২. স্থায়ী ঠিকানা: আবেদনকারীকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
৩. অভিজ্ঞতা: আগে থেকে কোনো ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকলেও সমস্যা নেই। তবে আবেদনকারীর একটি বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ধারণা (Business Idea) থাকতে হবে।
৪. ফি বা খরচ: এ কর্মসূচিতে আবেদন করার জন্য কোনো টাকা লাগবে না, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আবেদন করা যাবে।
কোন কোন খাতে ব্যবসা শুরু করা যাবে?
তরুণরা যেকোনো বৈধ ব্যবসা বা উদ্যোগের জন্য এই অর্থায়নের সুবিধা পেতে পারেন। তবে উল্লেখযোগ্য কিছু খাত হলো:
- কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ
- হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প
- মৎস্য চাষ ও পশুপালন
- পর্যটন ও সেবা খাত
- প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ
আপনার যদি ওপরের যেকোনো একটি বিষয়ে নতুন ও বাস্তবসম্মত কোনো ধারণা থাকে, তবে আপনিও এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব এলাকায় এ কার্যক্রম শুরু হবে
শুরুতেই পুরো দেশে একযোগে কাজ শুরু হচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে ৮টি বিভাগের ৮টি জেলার মোট ৬৪টি উপজেলায় এই কর্মসূচি চালু করা হবে।
প্রথম ধাপের ৮টি জেলা হলো:
- মানিকগঞ্জ
- ফেনী
- নওগাঁ
- ঝিনাইদহ
- ভোলা
- হবিগঞ্জ
- রংপুর
- নেত্রকোনা
এই ৮টি জেলার প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন উদ্যোক্তাকে প্রথম দফায় বেছে নেওয়া হবে। পরবর্তীতে এটি দেশের সব উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে এবং প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার তরুণকে এ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আবেদনের সময়সূচী ও নিয়মাবলি
আগ্রহী উদ্যোক্তারা সরাসরি নিজ নিজ উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় গিয়ে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে পারবেন।
- সার্কুলার প্রকাশের তারিখ: আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক বিস্তারিত দিকনির্দেশনাসহ আনুষ্ঠানিক সার্কুলার জারি করবে।
- আবেদনের সময়: সার্কুলার জারির পর থেকে টানা ১ মাস পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ থাকবে।
অর্থায়নের পাশাপাশি আর কী কী সুবিধা মিলবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তরুণদের শুধু টাকা দিয়েই ছেড়ে দেওয়া হবে না। তাদের সফল ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহায়তাও বিনামূল্যে দেওয়া হবে।
- উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ: ব্যবসা কীভাবে চালাতে হয়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
- মেন্টরিং: অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরাসরি পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
- রেজিস্ট্রেশন ও প্ল্যান তৈরিতে সাহায্য: ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসা নিবন্ধন ও সঠিক বিজনেস প্ল্যান বানাতে সাহায্য করা হবে।
- বাজার সংযোগ (Market Linkage): তৈরি করা পণ্য যেন সহজে বাজারে বিক্রি করা যায়, সেই সুযোগ করে দেওয়া হবে।
নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ
উপজেলা পর্যায়ের তরুণদের হাত ধরে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়াই এই প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে শত শত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হবে, অন্যদিকে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আপনি যদি ২৮ বছর বা তার কম বয়সী একজন তরুণ হন এবং আপনার মাথায় যদি কোনো নতুন ব্যবসার চমৎকার আইডিয়া থাকে, তবে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করুন। ১৬ সেপ্টেম্বর সার্কুলার প্রকাশের পর নিজ উপজেলার ব্যাংকে গিয়ে আবেদন ফরম জমা দিন এবং দেশের একজন সফল তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলুন।




