বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া (Begum Khaleda Zia) এক দৃঢ়চেতা, আপসহীন ও কিংবদন্তী নেত্রীর নাম। তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু দেশীয় রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। স্বামীর অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পর এক গৃহবধূ থেকে কীভাবে তিনি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের হাল ধরেছেন এবং স্বৈরাচারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় আপসহীন সংগ্রাম করেছেন- সেই জীবন, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার বিশদ গল্পই এই নিবন্ধের মূল বিষয়।
খালেদা জিয়ার জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল নাটকীয় এবং অপ্রত্যাশিত। তবে তাঁর প্রাথমিক জীবন ছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই।
পরিবার ও শিক্ষা
- জন্ম তারিখ, স্থান: খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায় (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) জন্মগ্রহণ করেন। তবে তিনি তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন দিনাজপুরের মুদিপাড়া গ্রামে।
- পারিবারিক পটভূমি: তাঁর বাবা এস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ফেনীর ফুলগাজীতে। পারিবারিক ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
- শিক্ষাগত অর্জন: তিনি দিনাজপুর সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশনে উত্তীর্ণ হন। রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের আগে পর্যন্ত তিনি প্রধানত একজন গৃহিণীই ছিলেন।
প্রারম্ভিক রাজনৈতিক প্রভাব
- পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব: তাঁর নিজের পরিবারে সরাসরি রাজনীতি না থাকলেও, ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের পর থেকেই তাঁর জীবনে রাজনৈতিক আবহ তৈরি হতে থাকে। স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৭ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে পরিচিত হন।
- প্রাথমিক রাজনৈতিক আগ্রহ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনীর অধীনে বন্দী ছিলেন। যুদ্ধের সময় চরম প্রতিকূলতা এবং পরবর্তীতে স্বামীর সামরিক ও রাজনৈতিক জীবন তাঁকে রাজনীতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়। তবে তাঁর রাজনৈতিক মাঠে প্রবেশ ঘটে স্বামীর হত্যার পর এক চরম রাজনৈতিক শূন্যতার মুহূর্তে।
খালেদা জিয়ার পারিবারিক জীবন ও ব্যক্তিত্ব
পারিবারিক প্রভাব ও শিক্ষা
রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও খালেদা জিয়া তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন আদর্শবাদী মায়ের ভূমিকা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ তাঁকে জীবনের কঠিন সময়ে মনোবল জুগিয়েছে।
স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহিত জীবন ছিল সামরিক নিয়মানুবর্তিতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সান্নিধ্যের মিশেল। তাঁদের দুই পুত্র- তারেক রহমান (বর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) এবং আরাফাত রহমান কোকো (প্রয়াত)। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি দুই পুত্রকে লালন-পালন ও গৃহস্থালির কাজে মনোনিবেশ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামই তাঁকে কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও চরিত্র
খালেদা জিয়ার সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর আপসহীনতা। এই নৈতিক দৃঢ়তাই তাঁকে দীর্ঘ সময়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এবং রাজনৈতিক জীবনে নীতি ও আদর্শে অটুট থাকতে সাহায্য করেছে।
রাজনৈতিক জীবনে মাইলফলক অর্জন
বিএনপিতে আগমন ও ভূমিকা
- রাজনৈতিক প্রবেশ: ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বিএনপি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি দলের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন।
- দলের হাল ধরা: ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং পরবর্তীতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
- সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন: তাঁর নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে সাতদলীয় জোট গঠিত হয় এবং জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ, আপসহীন সংগ্রামে তিনি নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনে তিনি বহুবার গৃহবন্দী হন।
- আওয়ামীলীগ সরকার বিরোধী আন্দোলন: তার নেত্রীতে দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগন সোচ্চার এবং প্রতিবাদ করে। শেখ হাসিনার শাসন আমলে বাংলাদেশের মানুষের উপর গুম, খুন, হামলা, মিথ্যা মামলা, কোন কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ
- বিজয়: স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন হলে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলিতেই জয়লাভ করেন।
- ইতিহাস সৃষ্টি: ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ইতিহাসে নাম লেখান। তিনি বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।
পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার সময়কাল
খালেদা জিয়া মোট তিনবার (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬ সালের সংক্ষিপ্ত সময়কাল এবং ২০০১-২০০৬) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নীতি প্রণয়ন
- সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন: ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন, যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে।
- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: তৃতীয় মেয়াদে (২০০১-২০০৬) তাঁর শাসনামলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে ছিল। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
- আইন-শৃঙ্খলা: আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে অপারেশন ক্লিন হার্ট ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন তাঁর অন্যতম আলোচিত পদক্ষেপ।
- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বৃদ্ধি, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় অনুদান প্রদান এবং বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন।
রাজনৈতিক যাত্রা ও নেতৃত্ব
বিএনপিতে সংযোজন
- বিএনপিতে পদোন্নতি ও ভূমিকা: দলের সংকটকালীন মুহূর্তে হাল ধরে তিনি শুধু চেয়ারপারসনই হননি, গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেকে দলীয় সীমার বাইরে দেশের মানুষের নেতায় পরিণত করেছেন।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
- দায়িত্ব গ্রহণের সময়কাল: দেশকে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে আনা, সংসদের প্রাণবন্ত আলোচনা এবং বিরোধী দলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তাঁর প্রথম মেয়াদের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল।
চ্যালেঞ্জ ও সংকট মোকাবিলা
- রাজনৈতিক দাঙ্গা ও ষড়যন্ত্র: রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে তাঁকে বহুবার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
- আপসহীন নেতৃত্বের উদাহরণ: স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে কোনো প্রকার আপস না করে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া তাঁর আপসহীনতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের বিশেষত্ব
আপসহীন ও দৃঢ়চেতা মনোভাব
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের মূল মন্ত্র ছিল আপসহীনতা। নীতি ও আদর্শ থেকে সরে না আসার এই মনোভাব তাঁকে জনমনে “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা
চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধের মধ্যেও তিনি শাসন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষা প্রচার
নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। নারী শিক্ষায় উৎসাহ প্রদানে বিভিন্ন বৃত্তি ও সুযোগ-সুবিধা চালু করা হয়।
নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিক্রিয়া
রাজনৈতিক দাঙ্গা ও সংকটকালীন পরিস্থিতি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলের দীর্ঘ আন্দোলন এবং পরবর্তীতে নিজ দলের ওপর আসা দমন-পীড়ন তাঁকে বারংবার কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছিল।
আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক সমাধান
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি দুইবার দায়িত্ব পালন করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন।
ধৈর্য ও স্থিরচেতা মনোভাবের উদাহরণ
দীর্ঘ কারাবাস এবং পারিবারিক ক্ষতি সত্ত্বেও তাঁর ধৈর্য ও নীতিতে স্থির থাকা তাঁর মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক।
সংগ্রাম ও প্রতিকূলতা
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে তাঁকে আজীবন কঠোর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্ষতি
রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও তিনি স্বামী হারানো, ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের অকালমৃত্যু এবং বড় ছেলে তারেক রহমানের নির্বাসনের মতো ব্যক্তিগত ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
আদালত ও রাজনৈতিক বাধা
জীবনের শেষ পর্যায়ের পূর্বেও তাঁকে রাজনৈতিক মামলার বোঝা এবং দীর্ঘকাল কারাবন্দী থাকতে হয়েছে, যা তাঁর সংগ্রামের এক মর্মান্তিক অধ্যায়।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের নির্যাতন
মইনুল হক সড়কের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ
ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল হক সড়কের বাড়ি (বাড়ি-৬)। এই বাড়িটি তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে সামরিক বাহিনী কর্তৃক বরাদ্দকৃত ছিল। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ার পর এই বাড়িতেই বসবাস শুরু করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও সামরিক বিধি অনুযায়ী খালেদা জিয়া সেখানে বসবাস করছিলেন।
- সময়কাল: ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর।
- ঘটনা: স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ক্রোধ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে তার সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে জোর করে, এক কাপড়ে এবং অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল।তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, সরকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাঁকে উচ্ছেদ করেছে। তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে বের হননি, তাঁকে জোর করে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তিনি আল্লাহর কাছে এর বিচার দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ঐতিহাসিক এই বাড়িটি থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করার মাধ্যমে সরকার তাঁকে এবং তাঁর দল বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে চেয়েছিল।
স্বৈরাচার সরকারের মিথ্যা মামলা ও জেল-জুলুমের অভিযোগ
তৎকালিন স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এবং খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছে, যার ফলে তাঁকে জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে।
মিথ্যা মামলার সংখ্যা ও প্রকৃতি
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার সংখ্যা অনেক এবং এগুলো বিভিন্ন প্রকৃতির:
- দুর্নীতির মামলা: সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলো হলো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা। এই মামলাগুলোতে তাঁকে যথাক্রমে দশ বছর ও সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
- রাষ্ট্রদ্রোহ ও নাশকতার মামলা: তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, এবং নাশকতার উস্কানির মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগ এনেও মামলা দায়ের করা হয়েছে।
- মানহানির মামলা: যুদ্ধাপরাধী এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত মন্তব্যের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মানহানির মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়।
কারাবাস ও দণ্ড স্থগিত
- জেল ও দণ্ড: ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে প্রথমে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং পরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর অধীনে একটি কেবিনে রাখা হয়।
- শারীরিক অসুস্থতা: কারাবন্দী থাকা অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে, যা নিয়ে বিএনপি বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে পাঠানোর দাবি জানায়।
- শর্তসাপেক্ষে মুক্তি: ২০২০ সালের মার্চ মাসে সরকার নির্বাহী আদেশে তাঁর দণ্ড স্থগিত করে তাঁকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেয়। মুক্তির শর্ত ছিল-তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।
উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি না দেওয়া
খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি না দেওয়া তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের অন্যতম জঘন্য একটি সিদ্ধান্ত। দেশের সর্বস্তরের জনগন এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বলে অভিযোগ করেছিল।
প্রেক্ষাপট ও শর্তসাপেক্ষে মুক্তি
- শারীরিক অবস্থার অবনতি: ২০২০ সালের মার্চ মাসে সরকার যখন নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়, তখন তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
- মুক্তির শর্ত: সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির (Code of Criminal Procedure – CrPC) ৪০১ ধারা অনুযায়ী তাঁর দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তাঁকে মুক্তি দেয়। এই মুক্তির দুটি প্রধান শর্ত ছিল:
- বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে।
- দেশের বাইরে যাওয়া যাবে না।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসকরা বারবার দাবি করেছেন যে তিনি গুরুতর অসুস্থ (যেমন: লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং আর্থ্রাইটিস)। তাঁর জীবন বাঁচাতে এবং তাঁকে স্থায়ীভাবে সুস্থ করতে দেশে পর্যাপ্ত উন্নত চিকিৎসা সুবিধা নেই; তাই জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে বিদেশে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, খালেদা জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাঁকে যে মানবিক বিবেচনায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেটাই সর্বোচ্চ সুবিধা। আইন মেনেই তাঁকে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না, যদিও তাঁকে দেশের অভ্যন্তরে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক ও মানবিক বিতর্ক
দেশের মানুষ এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ এবং ‘রাজনৈতিক নিপীড়নের’ চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকার খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
- বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং সুশীল সমাজ তাকে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছিল।
- রাজনৈতিক চাপ এবং মানবিক আবেদন সত্ত্বেও তৎকালীন সরকার তাদের অবস্থানে অনড় থাকে এবং তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে।
কারাগারে স্লো পয়জনিং-এর অভিযোগ
বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে থাকাকালীন ‘স্লো পয়জনিং’ (Slow Poisoning) বা ধীর গতির বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে তাঁর দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক দল বেশ কয়েকবার অভিযোগ করেছিল।
অভিযোগের উৎস ও ভিত্তি
- খালেদা জিয়ার চিকিৎসকরা এবং বিএনপি নেতারা বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছেন যে কারাগারে থাকাকালীন তাঁর স্বাস্থ্যের হঠাৎ অবনতি এবং কিছু অস্বাভাবিক শারীরিক জটিলতা তৈরি হওয়ার পেছনে স্লো পয়জনিং থাকতে পারে।
- তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন যে তাঁর দেহে যে ধরনের অজানা বিষক্রিয়ার লক্ষণ এবং জটিল রোগের (যেমন: লিভার সিরোসিস) উৎপত্তি হয়েছে, তা সাধারণ বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে নাও হতে পারে। তাঁরা দাবি করেন, এসব উপসর্গ স্লো পয়জনিং-এর দিকে ইঙ্গিত করে।
- এই স্লো পয়জনিং-এর সন্দেহ থেকেই তাঁরা জোর দিয়েছিলেন যে তাঁকে দ্রুত দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, যেখানে এই ধরনের অজানা বিষক্রিয়ার উৎস এবং তার প্রতিকার সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।
- রাজনৈতিক নিপীড়ন প্রমাণ: সরকার কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং জীবননাশের মাধ্যমেও তাদের নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছিলেন।
৫ আগস্ট ২০২৪: মুক্তির পটভূমি
জুলাই অভ্যুত্থান (বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন)– এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন হলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক খালেদা জিয়ার মুক্তির ঘোষণা আসে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ক্ষমতাচ্যুতি
- ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর: ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন এবং ব্যাপক গণপ্রতিরোধের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন। এর মাধ্যমে প্রায় ১৫ বছরের আওয়ামী সরকারের শাসনের অবসান ঘটে।
মুক্তির সিদ্ধান্ত ঘোষণা
- ৫ আগস্ট, সন্ধ্যায়: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান, প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা (বিএনপিসহ), সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং আন্দোলনকারী ছাত্র নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
- সিদ্ধান্ত: এই বৈঠকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল- বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও অন্যান্য রাজনৈতিক মামলায় আটক সব বন্দীকে মুক্তি দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়।
নির্বাহী আদেশে মুক্তি
- ৬ আগস্ট, ২০২৪ (পরদিন): রাষ্ট্রপতির প্রেস উইংয়ের মাধ্যমে এক বিজ্ঞপ্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে তাঁর সাজা মওকুফ করে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
নারী নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার অবদান
নারীদের ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার প্রচার
তিনি নারীদের রাজনীতি ও প্রশাসনে অংশগ্রহণে উৎসাহ দিয়েছেন এবং শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে নারীর সার্বিক উন্নয়নকে জাতীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
নারী-নেতৃত্বের মডেল হিসেবে খালেদা জিয়া
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এদেশের নারী সমাজের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রতিকূলতার মধ্যেও নারীরা সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন
দেশপ্রেম ও নৈতিক নেতৃত্ব
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা তাঁকে নৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
আপসহীন মনোভাব ও স্থিরচেতা মন
তিনি মনে করতেন, দেশের স্বার্থ এবং জনগণের অধিকারের প্রশ্নে কোনো প্রকার আপস করা উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা: খালেদা জিয়ার নীতি
খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন থাকা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দেশের স্বার্থে কাজে লাগানো। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সাথে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে তাঁর নীতি স্বতন্ত্র ছিল।
ভারতের সাথে সম্পর্ক ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা
খালেদা জিয়ার শাসনামলে ভারতের সাথে সম্পর্ক প্রায়শই চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। তবে তাঁর নীতিতে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।
- ‘চোখে চোখ রেখে’ কথা বলা: তাঁর প্রধান রাজনৈতিক দর্শন ছিল দেশের স্বার্থে কোনো প্রতিবেশী শক্তির কাছে নতজানু না হওয়া। ভারতের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে, যেমন+ সীমান্ত সমস্যা, পানিবণ্টন (ফারাক্কা), এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে তিনি সাহসী ও স্পষ্ট ভাষায় আলোচনা করেছেন।
- ফারাক্কা চুক্তি বিতর্ক: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে যে চুক্তি হয়, বিএনপি সরকার তার সমালোচনা করে এবং এটিকে দেশের জন্য ক্ষতিকর বলে অভিহিত করে। পরবর্তীতে বিএনপি ভারত-বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পানিবণ্টন বিষয়েও কঠোর অবস্থান নেয়।
- নিরাপত্তা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ: তাঁর শাসনামলে ভারত প্রায়শই আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করত। খালেদা জিয়ার সরকার সবসময়ই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই ধরনের অভিযোগ মোকাবিলা করেছে।
- পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর তার মন্তব্য: তিনি বলেছিলেন “পিলখানায় যা ঘটেছে, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গভীর ষড়যন্ত্র। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। আমি মনে করি, এর পেছনে দেশি-বিদেশি চক্রের হাত ছিল। তিনি আরও বলেছিলেন শেখ হাসিনা ও মইনুদ্দিন সব জানত।” ভারতকে এই ষড়যন্ত্রের মূল হিসেবে দেশের জনগন মনে করে থাকে।
ইসলামী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।
- মুসলিম উম্মাহর সাথে সম্পর্ক: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা হয়।
- অর্থনৈতিক সহযোগিতা: এই দেশগুলো থেকে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য সহযোগিতা চাওয়া হয়।
- ওআইসি (OIC) ভূমিকা: ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-এর প্ল্যাটফর্মে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যেকার বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
ভারত ও মুসলিম বিশ্ব ছাড়াও আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে খালেদা জিয়ার সরকার সক্রিয় ছিল।
- সার্ক (SAARC)-এ নেতৃত্ব: তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর চেয়ারপারসন হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন করেন (প্রথমবার ১৯৯৩-৯৪ সালে এবং দ্বিতীয়বার ২০০৫ সালে)। এই সময়ে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
- আন্তর্জাতিক সমর্থন: গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সাথে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার নীতি। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন ভারতের সাথে দেশের স্বার্থ নিয়ে আপস করেননি, তেমনি মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির ক্ষেত্র প্রসারিত করেছেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিক্ষানীতি: খালেদা জিয়ার শাসনামল (১৯৯১-৯৬, ২০০১-০৬)
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারসমূহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। এই নীতিগুলো বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ
খালেদা জিয়ার শাসনামলে (বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে) দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি আসে এবং বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কার শুরু হয়।
উদারীকরণ ও প্রবৃদ্ধি
- উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি: ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর তাঁর সরকার উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি (Open Market Economy) নীতিকে আরও গতিশীল করে। বেসরকারীকরণকে উৎসাহিত করা হয়, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে আকর্ষণ করতে সাহায্য করে।
- জিডিপি প্রবৃদ্ধি: ২০০১-২০০৬ সালের মেয়াদে বাংলাদেশ ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল, যা দেশের ইতিহাসে সেই সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। এটি কৃষি, শিল্প এবং সেবা—এই তিনটি খাতেই প্রবৃদ্ধি অর্জনের ফল।
- দারিদ্র্য হ্রাস: স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে এই সময়ে দেশে দারিদ্র্যের হার কিছুটা হ্রাস পায়।
- রেমিট্যান্স ও রপ্তানি: তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) খাতের দ্রুত প্রসার এবং প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সরকার সহায়ক নীতি গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষায় এই পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো
- বিশাল প্রকল্পের সূচনা: তাঁর সরকারের প্রথম মেয়াদে যমুনা বহুমুখী সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু) প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, যা দেশের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন আনে।
- বিদ্যুৎ খাত: বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হয়।
শিক্ষানীতি ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রভাব
শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারী শিক্ষায়, খালেদা জিয়ার সরকার যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা আজও দেশের সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নারী শিক্ষার প্রচার ও প্রসার
- বিনামূল্যে শিক্ষা: ১৯৯১ সালের শাসনামলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে এই সুবিধা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এটি নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য একটি মাইলফলক সিদ্ধান্ত ছিল।
- উপবৃত্তি ও ভাতা: গ্রামীণ এলাকায় মেয়েদের স্কুলে ভর্তির হার বাড়াতে নারী শিক্ষা উপবৃত্তি (Female Stipend Program) চালু করা হয়। এই কর্মসূচির ফলে মাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ভর্তির হার বৃদ্ধি পায়।
- প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক: প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়, যা দেশের সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য একটি মৌলিক পদক্ষেপ ছিল।
কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা
- শিক্ষানীতি প্রণয়ন: শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়নের জন্য সরকার একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।
- উচ্চশিক্ষা সংস্কার: এই সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সার্বিক প্রভাব
খালেদা জিয়ার সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগুলো দেশকে উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের পথে চালিত করেছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করেছে। অন্যদিকে, শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারী শিক্ষায় তাঁর নীতিগুলো সরাসরি নারীর ক্ষমতায়নে সাহায্য করেছে এবং দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে।
খালেদা জিয়ার শিক্ষণীয় দিক ও উত্তরাধিকার
ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
তাঁর জীবন শিক্ষা দেয় যে, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেও নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা উচিত।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাহসিকতা
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অদম্য সাহস এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার প্রচেষ্টা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নৈতিক ও মানবিক নেতৃত্বের পাঠ
ব্যক্তিগত ক্ষতি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন সত্ত্বেও জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাঁর নৈতিক ও মানবিক নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কিংবদন্তী
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে শুরু করে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে তাঁর জীবন ও সংগ্রাম দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আপসহীনতা, দৃঢ়চেতা মনোভাব ও দেশপ্রেমের কারণে তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী নন, বহু মানুষের কাছে তিনি গণতন্ত্রের প্রতিবাদের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্ব ও অবদান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
FAQs – খালেদা জিয়া সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
১. খালেদা জিয়ার জন্ম কোথায় এবং কখন?
উত্তর: ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায় (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) জন্মগ্রহণ করেন।
২. খালেদা জিয়া কবে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন?
উত্তর: প্রথমবার ১৯৯১ সালে।
৩. খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দল কোনটি?
উত্তর: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
৪. খালেদা জিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: আপসহীন নেতৃত্ব, দৃঢ়চেতা মনোভাব ও সাহসী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা।
৫. খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের উদাহরণ কী?
উত্তর: দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রশাসনিক চাপ, দাঙ্গা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা।