ইসলামের দাওয়াত ও দ্বীন প্রচারের সূচনাটা মোটেই সহজ ছিল না। সেই কঠিন ও সংকটময় দিনগুলোতে পুরুষ সাহাবিদের পাশাপাশি নারী সাহাবিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের সম্পদ, সাহস, ধৈর্য এবং জীবনের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ দিয়ে তারা দ্বীনকে বিজয়ী করতে কাজ করেছেন। ইসলামের জন্য প্রথম জীবন দিয়ে শহীদ হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন একজন নারী সাহাবি।
বিভিন্ন হাদিসের সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২০ জন নারী সাহাবি তাদের জীবনেই জান্নাতি হওয়ার বার্তা পেয়েছিলেন। এদের মধ্যে ১০ জন বিশিষ্ট মহীয়সী নারী সাহাবির অনুপ্রেরণাদায়ী পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো।
১. হজরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)
তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম প্রিয় স্ত্রী এবং সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারী নারী। ইসলামের শুরুর দিকের চরম সংকটময় মুহূর্তে তিনি নিজের সমস্ত সম্পদ, ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়ে নবীজি (সা.)-এর পাশে পাহাড়ের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
সহিহ বুখারির ৩৮২০ নম্বর হাদিসে এসেছে, ফেরেশতা জিবরিল (আ.) রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে খাদিজা (রা.)-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তার নিজের পক্ষ থেকে সালাম জানানোর নির্দেশ দেন। একই সাথে জান্নাতে তার জন্য মুক্তার তৈরি একটি বিশেষ প্রাসাদের সুসংবাদ দেন, যেখানে কোনো কষ্ট বা ক্লান্তি থাকবে না।
২. হজরত ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (রা.)
তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কনিষ্ঠ ও অত্যন্ত আদরের কন্যা, হজরত আলী (রা.)-এর স্ত্রী এবং জান্নাতি যুবকদের সর্দার হাসান-হুসাইনের (রা.) সম্মানিত রত্নগর্ভা মা।
নবীজি (সা.) নিজের ওফাতের আগে তার কানে ফিসফিস করে জানিয়েছিলেন যে, পরিবারের সবার মধ্যে তিনিই প্রথম তার সাথে গিয়ে মিলিত হবেন। একই সাথে তিনি জান্নাতবাসী সকল ঈমানদার নারীর সর্দার হবেন বলে সুসংবাদ লাভ করেন। (সহিহ বুখারি: ৩৬২৩)
৩. হজরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.)
তিনি ছিলেন প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর প্রজ্ঞাবান কন্যা এবং মহানবী (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামি ফিকহ, জ্ঞানচর্চা ও হাদিস বর্ণনায় তার অবদান ছিল অসামান্য।
তিরমিজি শরীফের ৩৮৮০ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ফেরেশতা জিবরিল (আ.) সবুজ রেশমি কাপড়ে মোড়ানো আয়েশা (রা.)-এর প্রতিচ্ছবি এনে নবীজি (সা.)-কে জানান, তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে নবীজির জীবনসঙ্গিনী।
৪. হজরত হাফসা বিনতে ওমর (রা.)
তিনি খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) কন্যা ও নবীজি (সা.)-এর সহধর্মিণী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইবাদতগুজার এবং প্রচুর নফল রোজা ও তাহাজ্জুদ আদায়কারী নারী।
একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সাময়িক তালাক দিলে জিবরিল (আ.) এসে বলেন “আপনি হাফসাকে ফিরিয়ে নিন। কারণ তিনি অত্যন্ত ইবাদতগুজার এবং জান্নাতেও তিনি আপনার স্ত্রী হবেন।” (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৬৭৯০)
৫. হজরত সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত (রা.)
তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদ। কেবল ঈমান আনার কারণে মক্কার কাফেররা তার ও তার পরিবারের ওপর চরম অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এত কষ্টের পরও তিনি ঈমানের পথ থেকে সামান্য বিচ্যুত হননি। শেষ পর্যন্ত আবু জাহেলের বর্শার আঘাতে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
নবীজি (সা.) তাদের এই ধৈর্য দেখে বলেছিলেন, “হে ইয়াসার পরিবার, তোমরা ধৈর্য ধারণ করো; তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান হলো জান্নাত।” (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৫৬২০)
৬. হজরত উম্মে জুফার (রা.)
তিনি ছিলেন মৃগী রোগে আক্রান্ত এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী সাহাবি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে তিনি যখন রোগের সুস্থতার জন্য দোয়ার অনুরোধ করেন, তখন নবীজি (সা.) তাকে দুটি পথ দেখান।
নবীজি (সা.) বলেন, “তুমি যদি ধৈর্য ধারণ করো, তবে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে।” সেই নারী সাহাবি জান্নাতের আশায় দুনিয়ার এই কষ্টকে হাসিমুখে বেছে নেন। (সহিহ বুখারি: ৫৬৫২)
৭. হজরত উম্মে সুলাইম রুমাইসা বিনতে মিলহান (রা.)
তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস (রা.)-এর মাতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে বলেন, “আমি জান্নাতে প্রবেশ করে কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, তিনি উম্মে সুলাইম রুমাইসা বিনতে মিলহান।” (সহিহ মুসলিম: ৬০৯৮)
৮. হজরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)
তিনি উম্মে সুলাইম (রা.)-এর আপন বোন ছিলেন। নবীজি (সা.) তার জন্য শাহাদাতের বিশেষ দোয়া করেছিলেন। পরবর্তীতে এক সামুদ্রিক অভিযানে অংশ নিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে তিনি শাহাদাতবরণ করেন এবং জান্নাতি কাফেলায় যুক্ত হন। (সহিহ বুখারি: ৬২৮২)
৯. হজরত ফাতেমা বিনতে আসাদ (রা.)
তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচি এবং হজরত আলী (রা.)-এর মা। নবীজি (সা.) তাকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। তার ইন্তেকালের পর নবীজি (সা.) নিজের জামা দিয়ে তাকে কাফন পরান এবং জানান যে জিবরিল (আ.) তাকে ফাতেমা (রা.)-এর জান্নাতবাসী হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। (আল মুস্তাদরাক: ৪৬৩১)
১০. হজরত উম্মে রোমান বিনতে আমের (রা.)
তিনি ছিলেন আয়েশা (রা.)-এর মা এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর স্ত্রী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদুষী ও দ্বীনের পথে অগ্রগামী। তার দাফনের সময় নবীজি (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি জান্নাতি হুর দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন উম্মে রোমানকে দেখে।” (তাবাকাতুল কুবরা: ১০৭১৩)
জান্নাতি নারী সাহাবিদের তালিকা ও সুসংবাদের মাধ্যম:
| সাহাবির নাম | বিশেষ পরিচয় | সুসংবাদের মাধ্যম / উৎস |
| হজরত খাদিজা (রা.) | প্রথম সহধর্মিণী ও সর্বাগ্রে ঈমান আনয়নকারী | জিবরিল (আ.)-এর মাধ্যমে জান্নাতি প্রাসাদের বার্তা |
| হজরত ফাতিমা (রা.) | নবীজির কনিষ্ঠ কন্যা | জান্নাতবাসী সকল নারীর সর্দার হওয়ার ঘোষণা |
| হজরত আয়েশা (রা.) | প্রজ্ঞাবান সাহাবি ও প্রিয়তমা স্ত্রী | আখেরাতেও রাসুল (সা.)-এর সঙ্গিনী হওয়ার সুসংবাদ |
| হজরত সুমাইয়া (রা.) | ইসলামের প্রথম শহীদ | ইয়াসার পরিবারকে রাসুল (সা.)-এর জান্নাতের প্রতিশ্রুতি |
| হজরত উম্মে জুফার (রা.) | ধৈর্যশীল নারী সাহাবি | রোগের চিকিৎসায় ধৈর্যের বিনিময়ে জান্নাতের সুসংবাদ |
ইসলামের সূচনার সেই কঠিন দিনগুলোতে এই মহীয়সী নারীদের ত্যাগ, ঈমানি দৃঢ়তা এবং ধৈর্য আজ পর্যন্ত সকল মুসলিম নারীর জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। মহান আল্লাহ আমাদের তাদের পবিত্র জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাওফিক দান করুন।




