Monday, September 14, 2026

ফোনের ব্যাটারি ও ডেটা খরচ কমাতে যে ৫টি সেটিংস এখনই বন্ধ করা উচিৎ

বহুল পঠিত

আজকের আধুনিক যুগে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সকালের অ্যালার্ম থেকে শুরু করে রাতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সবকিছুতেই আমাদের ফোনের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ব্যবহারকারীদের বড় একটি সমস্যা হলো ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং চোখের পলকে মোবাইল ডেটা বা ইন্টারনেট ফুরিয়ে যাওয়া।

আমরা অনেকেই মনে করি বেশি গেম খেললে বা ভিডিও দেখলে হয়তো চার্জ এবং ডেটা বেশি খরচ হয়। কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়, তবে মূল সমস্যাটি লুকিয়ে থাকে ফোনের ভেতরের কিছু লুকিয়ে থাকা সেটিংসে। স্মার্টফোনে এমন অনেক ফিচার বা সেটিংস থাকে, যেগুলো আমরা সরাসরি ব্যবহার না করলেও ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে সারাক্ষণ চালু থাকে। এগুলো যেমন নিঃশব্দে ফোনের ব্যাটারি ড্রেন করে, তেমনি ব্যাকগ্রাউন্ডে ইন্টারনেট ব্যবহার করে আপনার মূল্যবান ডেটা শেষ করে দেয়।

আপনি যদি একজন সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী হন এবং প্রতিদিন চার্জ দেওয়া ও দ্রুত এমবি (MB) শেষ হওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে চান, তবে এই প্রতিবেদনটি আপনার জন্য। আজ আমরা তুলে ধরবো অ্যান্ড্রয়েড ফোনের এমন ৫টি সেটিংস সম্পর্কে, যেগুলো এখনই বন্ধ করলে আপনার ফোনের ব্যাটারি ব্যাকআপ অনেক বেড়ে যাবে এবং ইন্টারনেট খরচ এক ধাক্কায় অর্ধেক হয়ে যাবে।

১. গুগল প্লে স্টোরের অটো-আপডেট অপশন বন্ধ করুন

আমাদের ফোনে শত শত অ্যাপ ইনস্টল করা থাকে। সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজিং, গেমস কিংবা ফটো এডিটিং সব অ্যাপেরই কিছুদিন পর পর নতুন আপডেট আসে। সাধারণত আমাদের ফোনে প্লে স্টোরের ‘অটো-আপডেট’ (Auto-update) ফিচারটি চালু করা থাকে। এর ফলে অ্যাপের নতুন কোনো আপডেট এলেই ফোন আপনার অজান্তেই ব্যাকগ্রাউন্ডে সেটি ডাউনলোড ও ইনস্টল করতে শুরু করে।

একসঙ্গে একাধিক বড় অ্যাপের আপডেট চালু হলে ফোনের প্রসেসরের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ফলে ফোন গরম হয়ে যায়, প্রচুর ব্যাটারি খরচ হয় এবং আপনার মোবাইল ডেটা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়।

এটি যেভাবে বন্ধ করবেন

১. প্রথমে আপনার ফোনের Google Play Store অ্যাপটি ওপেন করুন।

২. ওপরের ডান কোণায় থাকা আপনার প্রোফাইল ছবিতে (Profile Picture) ট্যাপ করুন।

৩. এখান থেকে Settings অপশনে যান।

৪. Network Preferences লেখা অপশনটিতে ক্লিক করুন।

৫. এবার Auto-update apps নির্বাচন করুন এবং সেখানে থাকা Don’t auto-update apps অপশনটি সিলেক্ট করে দিন।

উপকারিতা: এই সেটিংসটি বন্ধ করলে আপনার অনুমতি ছাড়া কোনো অ্যাপ নিজে নিজে আপডেট হবে না। যখন আপনার দরকার মনে হবে বা ওয়াই-ফাই সংযোগ থাকবে, তখন আপনি ম্যানুয়ালি অ্যাপ আপডেট করে নিতে পারবেন।

২. ওয়াই-ফাই ও ব্লুটুথ স্ক্যানিং ফিচারটি নিষ্ক্রিয় রাখুন

আমরা সাধারণত কোনো ডিভাইস সংযোগ করার জন্য ব্লুটুথ বা ওয়াই-ফাই ব্যবহার করি। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে গেলে সেটিংস থেকে ব্লুটুথ বা ওয়াই-ফাই আইকন বন্ধ করে দিলেও ভেতরের ‘স্ক্যানিং’ (Scanning) ফিচারটি বন্ধ হয় না।

ফোনের লোকেশন নির্ভুল রাখতে বা আশপাশের নতুন ডিভাইস ও নেটওয়ার্ক খোঁজার জন্য ফোন ব্যাকগ্রাউন্ডে সারাক্ষণ সার্চ করতে থাকে। এই অনবরত সার্চ করার প্রক্রিয়াটি ফোনের ব্যাটারির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি ফোনের ব্যাটারিকে ভেতরের দিক থেকে খুব দ্রুত খালি করে ফেলে।

এটি যেভাবে বন্ধ করবেন

১. আপনার ফোনের Settings-এ যান।

২. নিচের দিকে স্ক্রোল করে Location অপশনটিতে ট্যাপ করুন।

৩. সেখানে Location Services নামে একটি বিকল্প পাবেন, সেখানে প্রবেশ করুন।

৪. এবার Wi-Fi scanning এবং Bluetooth scanning এই দুটি অপশন খুঁজে বের করে বন্ধ (Off) করে দিন।

উপকারিতা: এই দুটি স্ক্যানিং বন্ধ রাখলে ফোনের লোকেশন সেবায় কোনো বড় ধরনের সমস্যা হয় না, কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডের অপ্রয়োজনীয় সার্চিং বন্ধ হওয়ার কারণে ব্যাটারি অনেকক্ষণ স্থায়ী হয়।

৩. কম ব্যবহৃত অ্যাপের ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা বন্ধ করুন

আমরা প্রতিদিন ফোনে যতগুলো অ্যাপ ব্যবহার করি, তার চেয়ে অনেক বেশি অ্যাপ ফোনে ইনস্টল করা থাকে। উদাহরণস্বরূপ বিভিন্ন শপিং অ্যাপ, অফলাইন গেমস, ভ্রমণ সম্পর্কিত অ্যাপ ইত্যাদি। আমরা হয়তো দিনে বা সপ্তাহে একবার এই অ্যাপগুলো ওপেন করি। কিন্তু আপনি কি জানেন, বন্ধ থাকা অবস্থায়ও এই অ্যাপগুলো ফোনের ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন নোটিফিকেশন পাঠায়?

এই ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন মোবাইল ডেটা দ্রুত ফুরিয়ে যায়, অন্যদিকে ফোনের মেমোরি ও ব্যাটারি দুটোই ক্ষয় হতে থাকে।

এটি যেভাবে বন্ধ করবেন:

১. ফোনের Settings অপশনে যান।

২. Apps বা App Management অপশনটি বাছাই করুন।

৩. এবার আপনার তালিকায় থাকা যেসব অ্যাপ আপনি কম ব্যবহার করেন (যেমন: শপিং অ্যাপ বা গেমস), সেটির ওপর ট্যাপ করুন।

৪. Mobile Data বা Data Usage অপশনে প্রবেশ করুন।

৫. নিচে থাকা Allow background data usage বা Background Data অপশনটি বন্ধ (Off) করে দিন।

উপকারিতা: এটি করলে আপনি অ্যাপটি ওপেন না করা পর্যন্ত সেটি ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনার কোনো ইন্টারনেট বা ব্যাটারি ব্যবহার করতে পারবে না।

৪. অ্যাপের অপ্রয়োজনীয় পারমিশন বা অনুমতি সরিয়ে নিন

একটি ছবি তোলার অ্যাপের জন্য ক্যামেরা এবং গ্যালারির পারমিশন প্রয়োজন হতে পারে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একটি টর্চলাইট অ্যাপ বা একটি সাধারণ গেম অ্যাপ যদি আপনার ফোনের লোকেশন, মাইক্রোফোন বা কনট্যাক্ট লিস্টের পারমিশন চায়, তবে সেটি চিন্তার বিষয়।

অনেক অ্যাপ অনাবশ্যক পারমিশন নিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনার লোকেশন ট্র্যাক করে অথবা অন্যান্য তথ্য আদান-প্রদান করে। এতে ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাক্টিভিটি বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি ব্যাটারি ড্রেন হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া এটি আপনার ব্যক্তিগত প্রাইভেসি বা নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

এটি যেভাবে বন্ধ করবেন

১. স্মার্টফোনের Settings-এ যান।

২. Privacy অপশনে ট্যাপ করে Permission Manager সিলেক্ট করুন।

৩. এখানে Location, Camera, Microphone ইত্যাদি আলাদা আলাদা তালিকা দেখতে পাবেন।

৪. যেকোনো একটি অপশনে (যেমন: Location) ক্লিক করে দেখুন কোন কোন অ্যাপ এটি ব্যবহার করছে।

৫. যেসব অ্যাপের লোকেশন বা অন্যান্য অনুমতির প্রয়োজন নেই, সেগুলোতে ট্যাপ করে Don’t Allow বা Disallow নির্বাচন করে দিন।

উপকারিতা: ফোনের প্রাইভেসি শতভাগ সুরক্ষিত থাকবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যাকগ্রাউন্ড সার্ভিস বন্ধ থাকায় ব্যাটারি লাইফ চমৎকার ব্যাকআপ দেবে।

৫. ডেভেলপার অপশন থেকে ‘মোবাইল ডেটা অলওয়েজ অ্যাক্টিভ’ বন্ধ করুন

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ‘Mobile Data Always Active’ নামে একটি অ্যাডভান্সড ফিচার থাকে। এই ফিচারটির কাজ হলো আপনি যখন ওয়াই-ফাই ব্যবহার করছেন, তখনও এটি ভেতরের মোবাইল ডেটা কানেকশন চালু রাখে। যাতে ওয়াই-ফাই সংযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হলে সাথে সাথে মোবাইল ডেটায় নেটওয়ার্ক সুইচ করতে পারে।

সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এই ফিচারটির খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু সারাক্ষণ ওয়াই-ফাই ও মোবাইল ডেটা দুটিই একসাথে সক্রিয় থাকায় ফোন প্রচুর পরিমাণে পাওয়ার বা ব্যাটারি চার্জ শোষণ করে।

এটি যেভাবে বন্ধ করবেন

১. প্রথমে আপনাকে ফোনের Developer Options চালু করতে হবে। এজন্য Settings > About Phone-এ গিয়ে Build Number লেখাটিতে পর পর ৭ বার দ্রুত ট্যাপ করুন।

২. এরপর ব্যাকে এসে Settings > System অথবা Additional Settings-এ গিয়ে Developer Options খুঁজে বের করে ভেতরে প্রবেশ করুন।

৩. নিচের দিকে স্ক্রোল করে Networking সেকশনে থাকা Mobile data always active অপশনটি খুঁজে নিন।

৪. এই অপশনটি টগল ক্লিক করে বন্ধ (Off) করে দিন।

উপকারিতা: আপনি যখন ওয়াই-ফাই ব্যবহার করবেন, তখন মোবাইল ডেটা পুরোপুরি ঘুমে (Idle mode) থাকবে। এতে ব্যাটারির চার্জ আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে থাকবে।

শেষ কথা ও কিছু প্রয়োজনীয় টিপস

স্মার্টফোনের ব্র্যান্ড (যেমন: Samsung, Xiaomi, Realme, Vivo, Oppo) এবং অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে এই সেটিংসগুলোর নাম বা ভেতরের অবস্থান সামান্য আলাদা হতে পারে। তবে মূল সেটিংসগুলো প্রতিটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনেই বিদ্যমান।

উপরের ৫টি সেটিংস পরিবর্তন করার পাশাপাশি ফোনের ডিসপ্লের ব্রাইটনেস বা আলো প্রয়োজন অনুযায়ী অটো না রেখে ম্যানুয়ালি ব্যবহার করা এবং ডার্ক মোড (Dark Mode) চালু রাখা উচিত। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো মেনে চললেই আপনার ফোন থাকবে দ্রুতগতির, ব্যাটারি দেবে দীর্ঘস্থায়ী সার্ভিস এবং বাঁচবে আপনার কষ্টের টাকায় কেনা মোবাইল ডেটা।

আরো পড়ুন

এবার হোয়াটসঅ্যাপেই দেওয়া যাবে বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের বিল: জেনে নিন সহজ নিয়ম

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা বড় সময় কাটে নানা ধরনের বিল মেটাতে গিয়ে। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাসের বিল, পানির বিল কিংবা ক্রেডিট কার্ডের টাকা সবকিছুর জন্য...

ফোন চুরি হলে দূর থেকে ব্যক্তিগত তথ্য মুছবেন যেভাবে

বর্তমান যুগে স্মার্টফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। ব্যাংকিং তথ্য, ব্যক্তিগত ছবি, প্রয়োজনীয় নথি, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে...

প্রিয় মুসলিম ওয়েব অ্যাপ: এক ক্লিকেই সব ইসলামিক সেবা ও নির্ভুল তথ্য

বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনচর্চায় মোবাইল ও ইন্টারনেটের ব্যবহার অপরিসীম। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের দৈনন্দিন ইবাদত-বন্দেগি, সঠিক তথ্য অনুসন্ধান এবং ইসলামি...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ