Saturday, August 1, 2026

‘কবুল’ বলা ছাড়াও যে ৫ শব্দ উচ্চারণ করলে বিয়ে হয়ে যায়: জানুন ইসলামী বিধান

বহুল পঠিত

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হলো দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে এক সুতোয় বাঁধার এক পবিত্র ও বৈবাহিক বন্ধন। ইসলামে বিয়েকে ইমানের অর্ধেক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এক হাদিসে প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বিয়ে করল, সে তার অর্ধেক ইমান (দ্বীন) পূর্ণ করে ফেলল। অতএব, বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে” (বায়হাকি, শুআবুল ইমান)।

অপর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, “হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম, সে যেন বিয়ে করে। কারণ, বিয়ে দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ, রোজা তার যৌন কামনাকে কমিয়ে দেয়” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

তবে আমাদের সমাজে বিয়ে নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। যার একটি হলো বিবাহ আকদের সময় পাত্রকে অবশ্যই ‘কবুল’ শব্দটিই মুখে উচ্চারণ করতে হবে, তা না হলে বিয়ে নাকি অসম্পূর্ণ থেকে যায়! প্রকৃতপক্ষে ইসলামী শরীয়াহ কী বলে? আজকের প্রতিবেদনে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

‘কবুল’ বলা কি বাধ্যতামূলক?

ইসলামী ফিকহশাস্ত্রের গবেষক ও আলেমাদের মতে, বিবাহের মূল মূলনীতি হলো ‘ইজাব ও কবুল’ অর্থাৎ প্রস্তাব প্রদান এবং তা সানন্দে গ্রহণ বা সম্মতি জ্ঞাপন করা।

এখানে ‘কবুল’ শব্দটি বলা কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। ইজাব বা বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার পর পাত্র যদি সরাসরি ‘কবুল’ না বলে “আলহামদুলিল্লাহ, আমি গ্রহণ করলাম” বা এ জাতীয় সম্মতিসূচক বাক্য উচ্চারণ করে, তবে তাতেই পূর্ণ সম্মতি প্রকাশ পায় এবং বিবাহ সম্পূর্ণরূপে সহিহ বা বৈধ হয়ে যায়।

‘কবুল’ ছাড়াও যে ৫টি শব্দে বিয়ে সম্পন্ন হয়

ইসলামী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী, ‘কবুল’ শব্দ ছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু শব্দ দিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করলে তা শরীয়াহ মতে কবুল হিসেবেই গণ্য হয়। এমন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও বাক্য নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ক্ববিলতু (قبِلتُ)

আরবি ভাষা ও শরীয়াহ অনুযায়ী ইজাবের জবাবে বর বা কনে যদি সরাসরি বলে ‘ক্ববিলতু’, তবে এর অর্থ দাঁড়ায় “আমি গ্রহণ করলাম”। এই শব্দটি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি প্রকাশ করে, তাই এটি পূর্ণ কবুল হিসেবে গণ্য হয়।

২. রদ্বিতু (رضِيتُ)

‘রদ্বিতু’ শব্দের সাধারণ অর্থ “আমি সন্তুষ্ট হলাম” বা “আমি রাজি হলাম”। বিয়ের ইজাব পেশ করার পর বর যদি বলে ‘রদ্বিতু’, তবে এর দ্বারা স্পষ্ট সম্মতি বোঝায় এবং এটিও কবুল হিসেবে ধরা হয়।

৩. তাজাওয়াজতুহা (تزوَّجتُها)

বর যদি নিজেই উদ্যোগী হয়ে বলে ‘তাজাওয়াজতুহা’ অর্থাৎ “আমি তাকে বিবাহ করলাম” তাহলে এটি বিবাহের সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ স্বীকৃতি। এতে আলাদা করে আর কবুল বলার প্রয়োজন পড়ে না।

৪. আনকাহতু নাফসি ইয়্যাহু (أنكَحتُ نَفسِي إيَّاهُ)

কনে বা বরের পক্ষ থেকে যদি বলা হয় ‘আনকাহতু নাফসি ইয়্যাহু’ অর্থাৎ “আমি নিজেকে তার সাথে বিবাহে আবদ্ধ করলাম” এই শব্দ চয়নের মাধ্যমেও বিয়ের পূর্ণ সম্মতি ও আকদ সম্পন্ন হয়ে যায়।

৫. আজাযতুহু (أجازَتُهُ)

যখন প্রতিনিধি বা ওকিলের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব বা ইজাব পাঠানো হয়, তখন মূল ব্যক্তি (বর বা কনে) যদি প্রস্তাব শুনে বলে ‘আজাযতুহু’ অর্থাৎ “আমি এটি অনুমোদন করলাম” তবে এটিও শরীয়াহ মতে নিকাহ সহিহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ইসলামী ফিকহ ও ফতোয়ার আলোকে

বিয়ের শব্দ চয়ন নিয়ে ইসলামের বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থগুলোতে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:

  • ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: এই গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, “নিকাহ বা বিবাহ এমন সব স্পষ্ট শব্দ দ্বারা জায়েজ ও বৈধ হয়, যেমন: أنكحتُ (আনকাহতু), تزوجتُ (তাজাওয়াজতু), قبلتُ (ক্ববিলতু), رضيتُ (রদ্বিতু) ইত্যাদি।”
  • আল-হেদাইয়া (২য় খণ্ড): হেদাইয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে, “ইজাব ও কবুল এমন যেকোনো শব্দে হতে পারে, যা দ্বারা স্পষ্টভাবে বিবাহ ও দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন বোঝায়।”

ইসলাম অত্যন্ত সহজ ও যৌক্তিক একটি ধর্ম। বিয়ে বা আকদের মূল বিষয় হলো দুইজন নারী-পুরুষের পারস্পরিক স্পষ্ট সম্মতি এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি। কেবল একটি নির্দিষ্ট শব্দের ওপর ভিত্তি করে বিয়ে সহিহ হওয়া নির্ভর করে না, বরং যেকোনো স্পষ্ট সম্মতিসূচক শব্দের মাধ্যমে পবিত্র এই বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

ধর্মীয় বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা এবং সামাজিক ভুল ধারণাগুলো দূর করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

আরো পড়ুন

সুদিনে ও দুর্দিনে মুমিনের করণীয়: ইসলাম কি বলে?

মানুষের জীবন কখনো একরকম যায় না। জীবনের পথে কখনো আসে সফলতা, অনাবিল আনন্দ ও সুখ-সমৃদ্ধি; আবার কখনো ঘিরে ধরে অভাব, রোগ-শোকাগ্নি ও নানা প্রতিকূলতা।...

মুসলিম হিসেবে যে ৫টি মৌলিক তথ্য সকলের জানা প্রয়োজন

ইসলাম কেবল একটি অনুশীলনের নাম নয়; এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পুরো মানবজাতির জন্য প্রেরিত এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনে ইবাদত, ইমান...

বিশ্বনবীর চোখে ১২ শ্রেষ্ঠ মানুষ: আদর্শ জীবনের অনন্য গাইডলাইন

ইসলাম কেবল কিছু নির্দিষ্ট ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। একজন মানুষের মর্যাদা শুধু তার সালাত বা সিয়ামের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ