মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত ও অলঙ্ঘনীয় সত্য। পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে কখন, কোথায় এবং ঠিক কী পরিস্থিতিতে আমাদের এই পার্থিব জীবনের ইতি ঘটবে তা একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। একজন খাঁটি মুমিনের আকুল আকুতি কেবল একটি দীর্ঘ জীবন পাওয়া নয়, বরং তার মূল উদ্দেশ্য হলো এমন এক মৃত্যু লাভ করা, যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলা চিরতরে সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং যা আখিরাতের অনন্তযাত্রায় পরম সফলতার দরজা খুলে দেয়।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় এই সুন্দর ও ঈমানি মৃত্যুকে বলা হয় ‘হুসনুল খাতিমাহ’ বা উত্তম পরিণতি। পবিত্র কুরআন ও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, আমরা কখন বা কোথায় মারা গেলাম তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মৃত্যুর সময় আমাদের ঈমানি অবস্থা কেমন ছিল।
তাই দুনিয়া ও আখিরাতে চূড়ান্ত সফলতা অর্জনের জন্য মৃত্যুর আগে আল্লাহর কাছে যে ৭ জিনিস চেয়ে নেবেন, সেগুলো আজকের প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কেন মৃত্যুর আগের ঈমানি অবস্থা এত গুরুত্বপূর্ণ?
মানুষ সারাজীবন যত আমলই করুক না কেন, তার শেষ পরিণতি বা হাশরের ময়দানের বিচার নির্ভর করে তার শেষ আমলের ওপর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের আমলের মূল্যায়ন হয় তার শেষ অংশের ভিত্তিতে। কোনো মানুষ যদি সারাজীবন ভালো কাজ করার পর জীবনের শেষ মুহূর্তে ঈমান থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, তবে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই ধ্বংস হয়ে যায়।
তাই প্রতিটি ইমানদার বান্দার উচিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহর দরবারে আকুল মিনতি করা, যেন তার শেষ নিঃশ্বাসটি ঈমানের সাথে নির্গত হয়।
মৃত্যুর আগে আল্লাহর কাছে যে ৭টি বিষয় চেয়ে নেবেন
কুরআন ও হাদিসের আলোকে একজন মুমিন তার জীবদ্দশায় এবং বিশেষ করে মৃত্যুর পূর্বে মহান আল্লাহর কাছে নিচের ৭টি পরম কাঙ্ক্ষিত জিনিস চেয়ে নেবেন:
১. ঈমানের ওপর খাঁটি মুসলিম হয়ে মৃত্যুবরণ
জীবনের সবচেয়ে বড় দৌলত হলো ঈমান। শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই ঈমানকে রক্ষা করা পরম সার্থকতা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যেভাবে ভয় করা উচিত সেভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী) অবস্থা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না।” (সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ১০২)
তাই প্রতিদিনের প্রার্থনায় আল্লাহর কাছে চাইতে হবে, যেন তিনি আমাদের চরম বিপদেও ঈমানের ওপর অবিচল রাখেন এবং পরম ঈমানদার অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার তাওফিক দেন।
২. নেক আমল বা ভালো কাজের মাঝে মৃত্যু
আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার ওপর খাস রহমত ও কল্যাণ চাইলে তাকে মৃত্যুর আগে ভালো কাজের তাওফিক দান করেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে (মৃত্যুর পূর্বে) নেক কাজে নিয়োজিত করেন। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, কীভাবে? তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে মৃত্যুর আগে সৎকাজের তাওফিক দেন এবং সেই অবস্থাতেই তার প্রাণ কবজ করেন।” (তিরমিজি: ২১৪২)
আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করব, যেন আমাদের মৃত্যু কোনো গুনাহ বা পাপকাজের মধ্যে না হয়ে বরং সালাত, জিকির, দান-সদকা বা অন্য কোনো নেক আমলে রত থাকা অবস্থায় হয়।
৩. মৃত্যুর সময় মুখে তাওহীদের কালিমা জারি থাকা
জীবনের শেষ বাক্যটি যদি হয় মহান আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি, তবে তার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কিছুই হতে পারে না। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন:
“যার সর্বশেষ বাক্য বা কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (আবু দাউদ: ৩১১৬)
মৃত্যুর কঠিন সাকরাতের সময়ে শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচিয়ে মুখে এই কালেমা জারি রাখার জন্য আল্লাহর কাছে অবিরাম ব্যাকুলতা প্রকাশ করতে হবে।
৪. পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন অবস্থায় বিদায় নেওয়া
ইসলাম পবিত্রেতার ধর্ম। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা বজায় রাখা মুমিনের অন্যতম প্রধান গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
“পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।” (সহিহ মুসলিম: ২২৩)
যদিও ওজু অবস্থায় মারা গেলে বিশেষ কোনো সহিহ ফজিলতের কথা নির্দিষ্ট করে বলা নেই, তবুও একজন মুমিন সর্বদা পবিত্র থাকতে পছন্দ করেন। তাই আল্লাহর কাছে চাহাত থাকা উচিত, যেন তিনি আমাদের আত্মিক ও শারীরিকভাবে পবিত্র অবস্থায় মৃত্যু দান করেন।
৫. জুমার দিন বা জুমার রাতে মৃত্যু (যদি তাতে কল্যাণ থাকে)
ইসলামে জুমার দিন ও রাত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে কোনো মুসলিম জুমার দিনে বা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফেতনা বা আজাব থেকে নিরাপদ রাখেন।” (তিরমিজি: ১০৭৪)
সপ্তাহের এই শ্রেষ্ঠ দিনে আল্লাহ যেন আমাদের ঈমানি মৃত্যু নসিব করেন, এই ফজিলাত পাওয়ার জন্য প্রভূর দরবারে বিনম্র প্রার্থনা করা যেতে পারে।
৬. প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার আগেই খাঁটি তাওবার তাওফিক
মানুষ মাত্রই ভুল ও গুনাহের ঊর্ধ্বে নয়। তবে মৃত্যুর আগে সব গুনাহ থেকে খাঁটি মনে তওবা করার সুযোগ পাওয়া আল্লাহর এক অশেষ নিয়ামত। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন:
“আল্লাহ তাআলা বান্দার তওবা গ্রহণ করতে থাকেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত বা সাকরাত শুরু হয়।” (তিরমিজি: ৩৫৩৭)
তাই হঠাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার আগেই যেন আমরা জীবনের সমস্ত ছোট-বড় পাপ থেকে ক্ষমা চেয়ে তওবা নসুহ বা খাঁটি তওবা করে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারি, সেই প্রার্থনা প্রতিনিয়ত করা আবশ্যক।
৭. সর্বোত্তম পরিণতি বা ‘হুসনুল খাতিমাহ’ লাভ করা
মুমিনের মূল গন্তব্য হলো জান্নাত। তাই তার জীবনের সার্বিক চাওয়া হওয়া উচিত একটি সুসংবাদময় শেষ পরিণতি। সুরা আল-আরাফে আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের একটি সুন্দর দোয়ার শিক্ষা দিয়েছেন:
“রব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরাও ওয়া তাওয়াফ্ফানা মুসলিমিন।”
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের ওপর ধৈর্য বর্ষণ করুন এবং আমাদের মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করান।” (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ১২৬)
যে বিষয়গুলোকে নিশ্চিত আলামত মনে করা ঠিক নয়
আমাদের সমাজে উত্তম মৃত্যু নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই নির্দিষ্ট করে দোয়া করেন বা মনে করেন:
- মৃত্যু যেন ঠিক ফজরের নামাজের সময় হয়।
- মৃত্যু যেন একদম সিজদারত বা নামাজরত অবস্থায় হয়।
- মৃত্যু যেন পবিত্র রমজান মাসেই হতে হবে।
- মৃত্যু যেন শুধু জায়নামাজে বসেই হতে হবে।
বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতামত: এসব বিশেষ মুহূর্ত বা স্থানে মৃত্যু হওয়া অত্যন্ত আনন্দের ও কাম্য; কিন্তু এগুলোই উত্তম মৃত্যুর একমাত্র নিশ্চিত আলামত বা সুনির্দিষ্ট সুন্নাত এমনটি প্রচার করা ঠিক নয়। কারণ কুরআন বা সহিহ হাদিসে নির্দিষ্টভাবে এগুলোকে ঈমানি মৃত্যুর একমাত্র শর্ত করা হয়নি।
আসল বিষয় হলো স্থান, কাল বা সময় যাই হোক না কেন—মৃত্যুর সময় প্রার্থীর অন্তরে ঈমান, মুখমণ্ডলে কালিমা এবং আমলনামায় তওবা ও সৎকাজ নিশ্চিত রয়েছে কি না।
মৃত্যুর জন্য আমাদের করণীয় ও প্রস্তুতি
মৃত্যু কোনো পূর্বাভাস দিয়ে আসে না। তাই নির্দিষ্ট স্থান বা সময়ের চিন্তা না করে আমাদের উচিত সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা। মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে আমাদের করণীয়:
- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা: জীবনের প্রতিটি নামাজকে শেষ নামাজ মনে করে আদায়ের চেষ্টা করা।
- পাপ থেকে দ্রুত তওবা করা: কোনো গুনাহ হয়ে গেলে কালক্ষেপণ না করে তখনই আল্লাহর কাছে অনুশোচনা করা।
- বান্দার হক আদায় করা: কারও অর্থ বা অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা জীবিত থাকতেই বুঝিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।
- জিকিরে জবান ভিজিয়ে রাখা: সর্বদা আল্লাহর স্মরণে জবান সচল রাখা, যাতে মৃত্যুর সময় মুখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কালিমার জিকির চলে আসে।
মৃত্যুর সময় বা স্থান নির্বাচন আমাদের হাতে নেই; কিন্তু ঈমানি জীবনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণরূপে আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাই আসুন, নির্দিষ্ট কোনো বাহ্যিক পরিস্থিতি খোঁজার চেয়ে আমাদের ঈমান, আমল, সঠিক আকীদা এবং তওবার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করি।
আসুন, প্রতিদিন শেষ মুনাজাতে আমরা মহান আল্লাহর কাছে আকুলভাবে মিনতি জানাই:
“হে আমাদের দয়ালু রব! আমাদের ঈমানের সাথে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দিন, ঈমানের ওপর সুন্দরময় মৃত্যু দান করুন, মৃত্যুর পূর্বে খাঁটি তাওবার তাওফিক দিন এবং আমাদের আখিরাতের ঠিকানাকে জান্নাতুল ফেরদাউসে পরিণত করুন। আমিন।”




