দীর্ঘদিনের প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সারাদেশের মসজিদগুলোর ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো বা জনবল কাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। এর মাধ্যমে ধর্মীয় সেবা প্রদানকারী এই মহান পেশার মানুষদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি গেজেটের মাধ্যমে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ এর আলোকে তাদের বিভিন্ন গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, নতুন গেজেট অনুযায়ী কে কোন গ্রেডে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
নতুন বেতন কাঠামো ও পদমর্যাদা
প্রকাশিত গেজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সরকার মসজিদ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত জনবলকে তাদের যোগ্যতা ও পদের গুরুত্ব অনুসারে বিভিন্ন গ্রেডে ভাগ করেছে। এতে সর্বোচ্চ ৫ম গ্রেড থেকে শুরু করে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে।
গেজেট অনুযায়ী নির্ধারিত পদ ও গ্রেডগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- সিনিয়র পেশ ইমাম: মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমামরা এখন থেকে সরকারি বেতন স্কেলের পঞ্চম গ্রেডে বেতন ও মর্যাদা পাবেন।
- পেশ ইমাম: পেশ ইমামদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ষষ্ঠ গ্রেড।
- ইমাম: সাধারণ ইমামরা জাতীয় বেতন স্কেলের নবম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
- মুয়াজ্জিন: মুয়াজ্জিনদের দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রধান মুয়াজ্জিন পাবেন দশম গ্রেড এবং সাধারণ মুয়াজ্জিনরা পাবেন ১১তম গ্রেড।
- খাদিম: খাদিমদের ক্ষেত্রেও দুটি ভাগ রয়েছে। প্রধান খাদিম ১৫তম গ্রেড এবং সাধারণ খাদিম ১৬তম গ্রেডে বেতন পাবেন।
- অন্যান্য কর্মী: মসজিদের নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য ২০তম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।
খতিবদের সম্মানী ও চুক্তির নিয়ম
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, জুমার নামাজের খতিবদের ক্ষেত্রে নিয়মটি কী হবে? গেজেটে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। খতিবদের সম্মানী বা বেতন নির্দিষ্ট কোনো গ্রেডে বাঁধা হয়নি। তাদের সম্মানী নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট মসজিদ পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী। অর্থাৎ, মসজিদ কমিটি এবং খতিব সাহেবের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেই সম্মানীর অঙ্ক ঠিক করা হবে।
কারা থাকছেন এই নিয়মের বাইরে?
সরকার সারাদেশের মসজিদের জন্য এই কাঠামো ঘোষণা করলেও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। গেজেটে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, যেসব মসজিদ সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় বা বিশেষ সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হয়, তারা এই নতুন বিধিমালার আওতামুক্ত থাকবেন।
যাদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়:
১. সরকার দ্বারা সরাসরি পরিচালিত মসজিদ (যেমন: জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ ইত্যাদি)।
২. বিভিন্ন সরকারি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মসজিদ।
৩. সারাদেশে নবনির্মিত ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা।
উল্লেখ্য, এই সব প্রতিষ্ঠানের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, সরকারি তহবিল বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। তাই তাদের ক্ষেত্রে নতুন করে এই গ্রেড পদ্ধতি কার্যকর করার প্রয়োজন নেই।
সরকারের এই উদ্যোগের গুরুত্ব
ধর্মপ্রাণ মানুষের দেশ বাংলাদেশে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ছিল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মসজিদ কমিটির দেওয়া সামান্য বেতনের ওপর তাদের নির্ভর করতে হতো, যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে সংসার চালানোর জন্য অপ্রতুল।
সরকারের এই যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে তাদের বেতন নির্ধারিত হবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি দেশের ধর্মীয় অঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




