ইসলামি বর্ষপঞ্জির ১১তম মাস হলো জিলকদ। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত চারটি ‘মর্যাদাপূর্ণ’ বা ‘সম্মানিত’ মাসের (আশহুরুল হুরুম) মধ্যে জিলকদ অন্যতম। এটি কেবল একটি মাস নয়, বরং হজের প্রস্তুতি এবং আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য সময়। আজকের প্রতিবেদনে আমরা জিলকদ মাসের ইতিহাস, তাৎপর্য এবং করণীয় আমলগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
জিলকদ নামের অর্থ ও প্রেক্ষাপট
আরবি ‘জুলকাআদাহ’ শব্দ থেকে জিলকদ নামের উৎপত্তি। এর অর্থ হলো বসা বা বিশ্রাম নেওয়া। প্রাচীন আরব সংস্কৃতিতে মানুষ শওয়াল মাসে ব্যবসা-বাণিজ্য শেষে জিলকদ মাসে সব ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থেকে বিশ্রাম নিত। ইসলামের আবির্ভাবের পর এই মাসের মর্যাদা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং সব ধরনের রক্তপাত নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
জিলকদ মাসের ৩টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য
১. হজরত মুসা (আ.)-এর তুর পাহাড়ের সাধনা: মুফাসসিরদের মতে, তুর পাহাড়ে হজরত মুসা (আ.) যে ৪০ দিন আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছিলেন, তার প্রথম ৩০ দিন ছিল জিলকদ মাস।
২. রাসুল (সা.)-এর ওমরাহ: প্রিয়নবী (সা.) তাঁর জীবনে চারটি ওমরাহ পালন করেছেন, যার তিনটিই ছিল জিলকদ মাসে।
৩. হজের প্রস্তুতি: যারা হজ পালনের জন্য মক্কায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য এই মাসটি শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করার চূড়ান্ত সময়।
জিলকদ মাসে করণীয় আমল
জিলকদ মাসে কোনো নির্দিষ্ট ফরজ ইবাদত নেই, তবে অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব।
- নফল রোজা: আইয়ামে বিজের রোজা (চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) এবং প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
- তওবা ও ইস্তিগফার: হজের সফরের আগে বা কুরবানির প্রস্তুতির আগে নিজেকে গুনাহমুক্ত করতে অধিক পরিমাণে তওবা করা উচিত।
- কুরবানির প্রস্তুতি: যারা হজে যাচ্ছেন না, তারা কুরবানির নিয়ম-কানুন শেখা এবং কুরবানির পশু নির্বাচনের প্রস্তুতির মাধ্যমে মাসটি অতিবাহিত করতে পারেন।
ইসলামের ইতিহাসে জিলকদ মাসের ঘটনাবলি
ইসলামের ইতিহাসে জিলকদ মাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- ১ জিলকদ: হজরত জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)-এর সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর বিয়ে।
- ১ জিলকদ: হজরত আলি ও ফাতেমা (রা.)-এর বিবাহ।
- ১৬ জিলকদ: ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি।
- ১৭ জিলকদ: খন্দকের যুদ্ধ।
- ২৫ জিলকদ: হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর জন্ম।
- ২৪ জিলকদ: নবীজি (সা.)-এর বিদায় হজের উদ্দেশ্যে যাত্রা।
জিলকদ মাস আমাদের ত্যাগের ইবাদত হজ ও কুরবানির দিকে নিয়ে যায়। তাই এই মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা, ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলা এবং বেশি বেশি নেক আমলের মাধ্যমে নিজেদের আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়াই একজন মুমিনের কর্তব্য। জিলকদ হোক আত্মশুদ্ধি ও প্রস্তুতির একটি বরকতময় মাস।




