বিগত কয়েক বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের মানুষ। এই কঠিন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে আগামী বাজেটে বড় ধরণের উদ্যোগ নিচ্ছে নতুন সরকার।
এবারের বাজেটে রাজস্ব বাড়ানোর প্রথাগত নিয়ম থেকে বেরিয়ে এসে, করের হার না বাড়িয়ে বরং করের জাল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যার ফলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহারের অনেক জিনিসপত্রের দাম বেশ কমে আসবে। অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় এই বড় ছাড়ের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে করছাড়: কমবে চাল-ডাল ও মসলার দাম
সংসার খরচ কমাতে সরকার সবচেয়ে বড় নজর দিয়েছে আমাদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকার ওপর। চাল, ডাল, তেল ও মসলার মতো প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করের হার এক ধাক্কায় অনেকখানি কমানো হচ্ছে।
চাল, ডাল ও তেলের দাম কমবে
বাজারের মূল খেসারত দিতে হয় চাল, আলু বা পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে। নতুন বাজেটে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ ও চিনির মতো পণ্যের ওপর উৎসে করের হার (Source Tax) আগের ৫%, ২% বা ১% থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এর ফলে বাজারে এসব পণ্যের দাম অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
রান্নার মসলার দাম কমছে
গৃহিণীদের জন্য আরেকটি ভালো খবর হলো, রান্নার প্রধান উপকরণ বিভিন্ন ধরণের মসলার ওপর থেকে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি (নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক) পুরোপুরি তুলে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে এলাচ, দারুচিনিসহ সব ধরনের গরম মসলার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে।
চিকিৎসার খরচ কমবে: স্বস্তি পাবেন রোগীরা
খাবারের পরেই মানুষের সবচেয়ে বড় খরচ হয় চিকিৎসার পেছনে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই বাজেট অত্যন্ত আনন্দের বার্তা নিয়ে আসছে।
- ওষুধের দাম কমবে: দেশের মানুষের চিকিৎসা খরচ কমাতে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
- হার্টের রিং ও চোখের লেন্স: হার্টের রিং এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স আমদানির ওপর থেকে ভ্যাট (VAT) পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এর ফলে প্রতি মাসে রোগীদের চিকিৎসার পেছনে বড় একটি অংক সাশ্রয় হবে।
- কিডনি ডায়ালাইসিস: কিডনি রোগীদের বড় খরচের জায়গা হলো ডায়ালাইসিস। এবার বাজেটে ডায়ালাইসিসের সেবামূল্য কমাতেও শুল্কহার কমানো হচ্ছে।
শিশুদের খাবার ও প্রসাধনীর দামেও বড় ছাড়
মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং নারীদের প্রতিদিনের সাজগোজের খরচ কমাতে বাজেটে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিশুখাদ্যের দাম কমবে
আমদানি করা শিশুখাদ্য তৈরির কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে। এর ফলে বাজারে বাচ্চাদের সব ধরনের দুধ ও পুষ্টিকর খাবারের দাম কমবে, যা বাবা-মায়েদের অনেক বড় দুশ্চিন্তা দূর করবে।
সাজগোজ ও প্রসাধনী সামগ্রী
রূপচর্চায় যারা দেশি প্রসাধনী ব্যবহার করেন, তাদের জন্য সুখবর। দেশে তৈরি ত্বক ফর্সাকারী প্রসাধনী, সানস্ক্রিন, হাত-পা ও নখের প্রসাধনী, পাউডার, লিপস্টিক এবং আইলাইনারের ওপর শুল্ক কমানো হচ্ছে। ফলে বাজারে এসবের দাম কমবে।
ইলেকট্রনিক্স ও ঘরের ব্যবহারের জিনিসপত্রের তালিকা
রান্নাঘরকে আধুনিক করতে এবং গরমের দিনে স্বস্তি পেতে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ওপরও করছাড় দেওয়া হচ্ছে। দাম কমতে পারে এমন কিছু ইলেকট্রনিক পণ্যের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- ওয়াটার পিউরিফায়ার বা পানি ফিল্টার
- ওয়াটার হিটার ও গিজার
- ইলেকট্রিক কুকার, ইন্ডাকশন কুকার ও ইনফ্রারেড কুকার
- ইলেকট্রিক চার্জার
- পিয়ানো এবং ফ্লোট গ্লাস
মোবাইল, সিমকার্ড ও স্বর্ণের দামে নতুন নিয়ম
প্রযুক্তি ও শখের পণ্যেও এবার বড় ধরণের পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের মুখে হাসি ফোটাবে।
মোবাইল ও সিমকার্ডের দাম
দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদন বাড়াতে এবং দাম কমাতে ফোন তৈরির ২২টি প্রয়োজনীয় উপাদানের ওপর অগ্রিম আয়কর ৫% থেকে কমিয়ে মাত্র ১% করা হচ্ছে। এর ফলে দেশে তৈরি স্মার্টফোনের দাম কমবে। এছাড়া সিমকার্ড ও ই-সিম কিনতে আগে ৩০০ টাকা নির্দিষ্ট কর দিতে হতো, এখন তার বদলে সিমের মূল্যের ওপর ১৫% ভ্যাট বসানো হয়েছে, এতেও সিমের দাম কমতে পারে।
স্বর্ণালংকারের দাম
আগে স্বর্ণের গয়না বিক্রির ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট নেওয়া হতো। এখন সেই নিয়ম বদলে ভরিপ্রতি মাত্র আড়াই হাজার টাকা নির্দিষ্ট কর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে গয়না কেনার খরচ আগের চেয়ে অনেকটাই কমবে।
কৃষিকাজে বড় সুবিধা: নিশ্চিত হবে খাদ্য নিরাপত্তা
দেশের কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃষি উপকরণের ওপর বড় ছাড় দিয়েছে সরকার। চাষাবাদে ব্যবহৃত জিংক সালফেট ও ম্যাগনেশিয়াম সালফেটসহ ৫টি প্রধান সারের ব্যবসা পর্যায়ের সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সাথে ফসলের কীটনাশক ও বালাইনাশকের ওপর থেকেও শুল্ককর তুলে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সারের দাম কমবে এবং কৃষকদের উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসবে।
সব মিলিয়ে, সরকারের এবারের বাজেটটি সাজানো হয়েছে সাধারণ মানুষের পকেট বাঁচানোর কথা চিন্তা করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, শিশুদের খাবার এবং কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই করছাড় দেশের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখন দেখার বিষয়, বাজারের ব্যবসায়ীরা সরকারের এই করছাড়ের সুবিধা সাধারণ ক্রেতাদের কাছে কত দ্রুত পৌঁছে দেন।




