বাংলাদেশ তথা পুরো বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যুক্ত হলো। বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন (TIME Magazine) প্রতি বছর বিশ্বের সবচেয়ে সেরা এবং কার্যকরী আবিষ্কারগুলোর তালিকা প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের সেই মর্যাদাপূর্ণ ‘বেস্ট ইনভেনশনস’ (Best Inventions) তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআর,বি (icddr,b)-এর তৈরি একটি বিশেষ খাদ্য ফর্মুলা।
অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের সুস্থ করে তুলতে এই ফর্মুলাটি বিশ্বজুড়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ভেতরের সব তথ্য।
কী এই খাদ্য ফর্মুলা এবং এর নাম কী?
আইসিডিডিআর,বি-র তৈরি এই স্বল্পমূল্যের ও সাশ্রয়ী খাদ্য ফর্মুলাটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘মাইক্রোবায়োটা-ডাইরেক্টেড কমপ্লিমেন্টারি ফুড’ (Microbiota-Directed Complementary Food) বা সংক্ষেপে MDCF-2।
সহজ কথায়, এটি এমন এক ধরণের পরিপূরক খাবার যা অপুষ্টির শিকার হওয়া শিশুদের পেটের ভেতরের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য উন্নত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।
যেভাবে কাজ করবে এই ম্যাজিক ফর্মুলা MDCF-2
সাধারণত গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শুধু পুষ্টিকর খাবার দিলেই তাদের দ্রুত ও সঠিক বৃদ্ধি হয় না। এর প্রধান কারণ হলো তাদের অন্ত্রের বা পেটের ভেতরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। আইসিডিডিআর,বি-র এই নতুন ফর্মুলাটি ঠিক এই জায়গাটাতেই কাজ করে:
- অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম পুনর্গঠন: মানুষের পেটে কোটি কোটি ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে, যাকে মাইক্রোবায়োম বলে। MDCF-2 এই ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকে আবার সতেজ করে তোলে।
- শারীরিক বৃদ্ধি ও ইমিউনিটি: এটি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- মস্তিষ্কের বিকাশ: অপুষ্টির কারণে শিশুদের মস্তিষ্কের যে ক্ষতি হয়, তা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা ও মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটাতে এটি দারুণ কার্যকর।
নেপথ্যের কারিগর ও যৌথ গবেষণা
এই অসাধারণ এবং মানবকল্যাণমূলক ফর্মুলাটি হুট করেই তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর গবেষণা। যৌথভাবে এই ফর্মুলাটি তৈরি করেছেন:
১. ড. তাহমিদ আহমেদ: আইসিডিডিআর,বি (icddr,b)-এর নির্বাহী পরিচালক ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী।
২. ড. জেফরি গর্ডন: আমেরিকার ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির (Washington University) নামকরা অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী।
ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (Clinical Trial)— সবখানেই এই ফর্মুলাটি অভাবনীয় ও অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত স্বল্প খরচে, যাতে দরিদ্র পরিবারের শিশুরাও সহজেই এই সুবিধা পেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ ফর্মুলার জয়জয়কার
টাইম ম্যাগাজিনের স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি এই ফর্মুলাটির কার্যকারিতা এখন বিশ্বজুড়ে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের সফল ট্রায়ালের পর বর্তমানে বিশ্বের আরও চারটি দেশে এই MDCF-2 নিয়ে বড় আকারের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দেশগুলো হলো:
| মহাদেশ | দেশের নাম |
| এশিয়া | ভারত ও পাকিস্তান |
| আফ্রিকা | মালি ও তানজানিয়া |
এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের হাত ধরে তৈরি হওয়া এই ফর্মুলাটি খুব শীঘ্রই সারাবিশ্বের কোটি কোটি অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখবে।
টাইম ম্যাগাজিনের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে আইসিডিডিআর,বি-র এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, সীমিত সম্পদ নিয়েও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা বিশ্বমানের গবেষণা করতে পারেন। MDCF-2 ফর্মুলাটি শুধু একটি আবিষ্কারই নয়, এটি লাখো শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের এক নতুন আলো। বিজ্ঞানীদের এই অসামান্য অর্জনে আমরা গর্বিত।




