বর্তমান যুগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছরই বাজারে নিয়ে আসছে নিত্যনতুন সব স্মার্টফোন। সামান্য একটু উন্নত ক্যামেরা, নতুন ডিজাইন কিংবা প্রসেসরের আকর্ষণে অনেকেই দ্রুত নিজের পুরোনো ফোনটি বদলে নতুন ফোন কিনে ফেলেন। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি দুই বছর পরপর ফোন বদলানোর এই অভ্যাসটি মোটেও সাশ্রয়ী নয়।
সঠিক নিয়মে যত্ন নিলে একটি ভালো মানের স্মার্টফোন চার থেকে পাঁচ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় অনায়াসে ব্যবহার করা সম্ভব। এতে যেমন আপনার পকেটের অপ্রয়োজনীয় খরচ বাঁচে, ঠিক তেমনি ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য কমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায়। আজ আমরা জানবো কীভাবে সামান্য কিছু যত্নের মাধ্যমে আপনার সাধের স্মার্টফোনটিকে দীর্ঘদিন নতুনের মতো সচল রাখবেন।
১. ফোনের ব্যাটারির স্বাস্থ্য ভালো রাখুন
একটি স্মার্টফোন কত বছর টিকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে তার ব্যাটারির স্থায়িত্বের ওপর। ব্যাটারি ভালো রাখতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস দিয়েছেন:
- চার্জের নিয়ম: ফোন কখনো ১০০ শতাংশ ফুল চার্জ করবেন না, আবার ০ শতাংশে নামিয়ে একদম বন্ধও করবেন না। ফোনের চার্জ সবসময় ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। এতে ব্যাটারির ওপর চাপ কম পড়ে।
- অতিরিক্ত তাপমাত্রা এড়িয়ে চলুন: অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশ ফোনের ব্যাটারির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রোদ লেগে বা গেম খেলার সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হলে কিছুক্ষণের জন্য ব্যবহার বন্ধ রাখুন।
- অপটিমাইজড চার্জিং: বর্তমানের আধুনিক স্মার্টফোনগুলোতে ‘অপটিমাইজড চার্জিং’ বা ‘স্মার্ট চার্জিং’ ফিচার থাকে। এই ফিচারটি অন করে রাখলে রাতে চার্জে বসিয়ে রাখলেও ব্যাটারির কোনো ক্ষতি হয় না।
২. ভালো মানের কভার ও স্ক্রিন প্রটেক্টর ব্যবহার করুন
হাত থেকে আচমকা ফোন পড়ে গিয়ে স্ক্রিন ফেটে যাওয়া বা বডিতে দাগ পড়া খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। এই ক্ষতি থেকে ফোনকে সুরক্ষিত রাখতে শুরুতেই ভালো মানের কভার বা ব্যাক কেস ব্যবহার করুন।
ডিসপ্লের সুরক্ষায় একটি উন্নত মানের টেম্পার্ড গ্লাস বা স্ক্রিন প্রটেক্টর লাগিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কভার এবং প্রটেক্টর ব্যবহারের ফলে ফোন হাত থেকে পড়ে গেলেও বড় ধরনের ফ্র্যাকচার বা ইন্টারনাল ড্যামেজ হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
৩. নিয়মিত ফোন পরিষ্কার রাখুন
আমরা সারাদিন ফোনটি যেখানে সেখানে রাখি। এর ফলে ফোনের চার্জিং পোর্ট, হেডফোন জ্যাক, স্পিকার গ্রিল এবং স্ক্রিনে প্রচুর ধুলাবালি ও ময়লা জমে। দীর্ঘ মেয়াদে এই ধুলাবালি ফোনের ভেতরে ঢুকে পারফরম্যান্স স্লো করে দিতে পারে, এমনকি চার্জিংয়েও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই সপ্তাহে অন্তত একবার একটি নরম সুতি বা মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে ফোনটি হালকাভাবে পরিষ্কার করুন। চার্জিং পোর্টের ময়লা পরিষ্কার করতে নরম টুথপিক বা ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন।
৪. সফটওয়্যার ও সিকিউরিটি আপডেট রাখুন
অনেকেই ফোনে সফটওয়্যার বা সিকিউরিটি আপডেট আসলে তা অবহেলা করে রেখে দেন। এটি করা একদমই উচিত নয়। নিয়মিত কোম্পানির পাঠানো অফিশিয়াল আপডেটগুলো ইনস্টল করলে ফোনে নতুন নতুন ফিচার যুক্ত হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, আপডেটগুলো ফোনের বাগ বা অভ্যন্তরীণ সমস্যা দূর করে ফোনকে হ্যাকারদের হাত থেকে নিরাপদ রাখে এবং ফোনের গতি বা পারফরম্যান্স আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দেয়।
৫. ফোনের স্টোরেজ ব্যবস্থাপনায় নজর দিন
ফোনের মেমোরি বা স্টোরেজ যখন একদম ফুল হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ফোন ধীরগতির বা স্লো হয়ে যায়। অনেক সময় ফোন ল্যাগ করা বা হ্যাং করার পেছনেও মূল কারণ থাকে অতিরিক্ত ফাইল।
তাই নিয়মিত আপনার ফোনের স্টোরেজ চেক করুন। অপ্রয়োজনীয় ও ডুপ্লিকেট ছবি, ফরওয়ার্ড হওয়া ভিডিও এবং বড় ফাইলগুলো ডিলিট করে দিন। গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো ফোনের মেমোরিতে না রেখে গুগল ড্রাইভ বা অন্য কোনো ক্লাউড স্টোরেজে ব্যাকআপ হিসেবে রেখে দিন।
৬. নতুন কেনার আগে মেরামতের কথা ভাবুন
ফোনের সামান্য কোনো সমস্যা হলেই অনেকে ধরে নেন যে ফোনটি নষ্ট হয়ে গেছে এবং নতুন ফোন কেনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় সামান্য খরচেই ফোন ঠিক করা সম্ভব।
যেমন, দুই বা তিন বছর ব্যবহারের পর ফোনের ব্যাটারি ব্যাকআপ কমে গেলে মাত্র কয়েকশ টাকা খরচ করে ভালো মানের একটি অরিজিনাল ব্যাটারি লাগিয়ে নিলেই ফোনটি আবার নতুনের মতো সার্ভিস দেবে। একইভাবে স্ক্রিন ফেটে গেলে শুধু ডিসপ্লে পরিবর্তন করেই ফোনটি আরও কয়েক বছর চালানো সম্ভব।
একটি স্মার্টফোন দীর্ঘদিন ব্যবহার করা কেবল একটি অর্থনৈতিক সাশ্রয়ী সিদ্ধান্তই নয়, এটি একটি পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপও বটে। বাজারে নিত্যনতুন ফোনের লোভনীয় অফার থাকবেই, তবে নিজের ফোনের সঠিক যত্ন নিয়ে সেটিকে দীর্ঘদিন ব্যবহার করার মাঝেই আসল বুদ্ধিমত্তা। ওপরের পরামর্শগুলো মেনে চললে আপনার স্মার্টফোনটি দীর্ঘদিন আপনার সঙ্গী হয়ে থাকবে।




