আন্তর্জাতিক রোবটিক্স অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য নতুন এক অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছে একদল প্রতিভাবান তরুণ শিক্ষার্থী। দূর প্রবাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ‘রোবোফেস্ট ২০২৬ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ অংশ নিয়ে তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করে দেশের জন্য মস্ত বড় এক সম্মান ও ট্রফি বয়ে এনেছে।
গত ১৪ থেকে ১৬ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সাউথফিল্ডে অবস্থিত লরেন্স টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে এই ২৭তম রোবোফেস্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের সেরা শিক্ষার্থীরা এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের তৈরি ও প্রোগ্রাম করা স্বয়ংক্রিয় রোবটের বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে অংশ নেয়।
‘বটলসুমো’ বিভাগে বাংলাদেশ দলের বাজিমাত
রোবোফেস্ট প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিভাগ ছিল ‘বটলসুমো’। এই বিভাগের মূল চ্যালেঞ্জ হলো একটি স্বয়ংক্রিয় রোবটকে তার প্রতিপক্ষের রোবট অথবা একটি নির্দিষ্ট বোতলকে টেবিলের বাইরে ঠেলে ফেলে দিতে হয়।
এই কঠিন লড়াইয়ের সিনিয়র ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের খুদে বিজ্ঞানীরা তাদের চমৎকার মেধা ও রোবটের অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশকে পেছনে ফেলে তারা গৌরবময় তৃতীয় স্থান অর্জন করে এবং অফিশিয়াল ট্রফি নিজেদের করে নেয়।
কারা ছিলেন এই বিজয়ী দলে?
বাংলাদেশ দলের এই সফলতার পেছনে ছিলেন সাতজন অদম্য তরুণ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ছয়জনই ঢাকার আন্তর্জাতিক হোপ স্কুল বাংলাদেশ-এর শিক্ষার্থী এবং একজন সিলেটের একটি জাতীয় শিক্ষাক্রমভিত্তিক কলেজের শিক্ষার্থী। পুরো দলটিকে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধান করেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘রোবোনটস ক্লাব’।
সাফল্য বয়ে আনা দলের গর্বিত সদস্যরা হলেন:
- মো. মানসিব আহসান (৭ম শ্রেণি)
- শায়ান সাদিদ জামান (৭ম শ্রেণি)
- ট্যাং তিয়ানসিং (৭ম শ্রেণি)
- নাসিফ আশাব খান জামি (৮ম শ্রেণি)
- ফারহান মোস্তফা (৯ম শ্রেণি)
- আবরার হাসান (৯ম শ্রেণি)
- আবদুর রহমান লাহি (১২শ শ্রেণি)
পুরো দলের সফল কোচ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এই তরুণদের সাথে সফর করেন মো. মুনজুর মোরশেদ।
রোবটিক্স কেবল রোবট তৈরি নয়, এটি একটি রণকৌশল
এই অসামান্য সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এই বড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশাল বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগী দলের প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক মানের স্টিম (STEAM) শিক্ষার নানা দিক সম্পর্কে তারা সরাসরি জানার সুযোগ পেয়েছে।
দলের সদস্য দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুর রহমান লাহি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলে, ‘রোবোফেস্টে অংশগ্রহণ আমাদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আমরা প্রবাসের মাটিতে এসে শিখেছি যে, রোবটিক্স মানে শুধু একটি সুন্দর রোবট তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সঠিক কৌশল, দলগত কাজ, চরম ধৈর্য এবং চাপের মুখে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক দক্ষতা।’
“সঠিক সুযোগ পেলে আমাদের তরুণরাই সেরা” কোচ
বাংলাদেশ দলের কোচ ও রোবোনটস ক্লাব-এর প্রধান নির্বাহী পরিচালক মো. মুনজুর মোরশেদ অত্যন্ত আনন্দের সাথে বলেন, ‘এই অর্জন কেবল একটি সুন্দর ট্রফি জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রবল আত্মবিশ্বাস, নিখুঁত শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার এক বাস্তব প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও বৈশ্বিক স্টিম ও রোবটিক্স অঙ্গনে যেকোনো দেশের সাথে সমানভাবে টক্কর দিতে পারে।’
এমনকি রোবোফেস্টের সহকারী পরিচালক শ্যানন পালোনিসও বাংলাদেশ দলের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘সিনিয়র বটলসুমো বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ। তারা আন্তর্জাতিক স্টিম ও রোবটিক্স প্ল্যাটফর্মে সফলভাবে যেকোনো দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করার যোগ্যতা রাখে।’
বাংলাদেশের তরুণদের এই আন্তর্জাতিক অর্জন শুধু একটি পদক বা ট্রফির জয় নয়; এটি বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা, নতুন উদ্ভাবনী শক্তি এবং আগামী প্রজন্মের উন্নত সক্ষমতার এক বলিষ্ঠ প্রমাণ।




