মানুষ এই পৃথিবীতে খালি হাতে আসে, আবার একদিন খালি হাতেই তার রবের দরবারে ফিরে যায়। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামান্য প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে আমরা কত কিছুই না করি! আমরা মেতে উঠি ভোগ-বিলাস, প্রতিযোগিতা আর সম্পদ জমানোর এক অন্তহীন দৌড়ে। দুনিয়ার চাকচিক্য আমাদের এমনভাবে অন্ধ করে দেয় যে, আমরা ভুলেই যাই—পরকালে প্রতিটি নিয়ামত, প্রতিটি সুযোগ এবং প্রতিটি ভোগের হিসাব দিতে হবে মহান আল্লাহর কাছে।
তবে ইসলাম আমাদের এমন কিছু মৌলিক বিষয়ের কথা বলেছে, যা জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য এবং এগুলোর জন্য বান্দাকে জবাবদিহি করতে হবে না। চলুন আজকের আর্টিকেলে আমরা সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সহজ ভাষায় জেনে নিই।
এক নজরে জেনে নিন সেই ৩টি জিনিস
ইসলামিক স্কলার ও বিখ্যাত তাবেঈ ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহ.) মানুষের জীবন ও প্রয়োজনকে খুব সহজভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে টেবিলের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | মানুষের মৌলিক প্রয়োজন (যার হিসাব নেই) |
| ১ | লজ্জাস্থান আবৃত করার জন্য এক টুকরা কাপড় বা পোশাক। |
| ২ | বেঁচে থাকার বা জীবন ধারণের জন্য সামান্য কিছু খাদ্য। |
| ৩ | মাথা গোঁজার বা রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচার মতো একটি সাধারণ আশ্রয় বা বাসস্থান। |
ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহ.)-এর গভীর উপলব্ধি
বিখ্যাত কিতাব ‘কিতাবুয যুহদ’ (২২১)-এ বর্ণিত হয়েছে, প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম হাসান আল-বাসরী (রহ.) বলেছেন:
“দুনিয়ায় মানুষের প্রয়োজন খুবই সামান্য; আর তাহলো লজ্জাস্থান আবৃত করার জন্য এক টুকরা কাপড়, জীবন ধারণের জন্য অল্প কিছু খাদ্য এবং মাথা গোঁজার জন্য একটি আশ্রয়। এর বাইরে দুনিয়ার যত নিয়ামত, সম্পদ ও ভোগ-বিলাস আছে, সবকিছুর হিসাব একদিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে।”
কত গভীর এবং সত্য এই কথা! মানুষ যে সম্পদের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে, যে বিলাসিতার জন্য নিজেকে দিন-রাত ক্লান্ত করে, সেই প্রাচুর্য কিন্তু কবরে সঙ্গে যাবে না। বরং এগুলো সম্পর্কে হাশরের মাঠে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সম্পদ কোথা থেকে আয় করেছিলে, আর কোন পথে তা ব্যয় করেছিলে?
এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনের সতর্কবাণী
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আমাদের অতিরিক্ত সম্পদ জমানো এবং দুনিয়ার মোহে মত্ত থাকার ব্যাপারে স্পষ্ট সতর্ক করেছেন। সূরা আত-তাকাসুর-এর ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ
অর্থ: “অতঃপর সেদিন অবশ্যই তোমাদেরকে নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সুরা আত-তাকাসুর: আয়াত ৮)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের সুস্বাস্থ্য, সম্পদ, সময়, পরিবার, অঢেল খাবার কিংবা বিলাসবহুল বাড়ি সবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। আর প্রতিটি বাড়তি নিয়ামতের সাথেই জড়িয়ে আছে বড় দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা।
হাদিসের আলোতে জবাবদিহিতা
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ও সম্পদের হিসাব সম্পর্কে সচেতন করেছেন। একটি বিখ্যাত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
“কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা দুটি একটুও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে, তার মধ্যে একটি হলো তার সম্পদ সম্পর্কে কোথা থেকে সে তা অর্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে।” (তিরমিজি, ২৪১৭)
আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পাঁচটি জিনিস আসার আগে পাঁচটি জিনিসকে মূল্যবান মনে করো (আল-মুস্তাদরাক, ৭৮৪৬)। এর মানে হলো আমাদের সময়, সুস্থতা, সামর্থ্য ও সুযোগ সবই আল্লাহর আমানত। এগুলো অবহেলায় নষ্ট করলে পরকালে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।
মুমিনের করণীয়: হৃদয়ের কিছু কথা
আজ আমাদের প্রয়োজনের চেয়ে চাওয়া বা লোভ অনেক বেশি। একটি সাধারণ ঘর থাকলে আমাদের আরেকটি বড় বাড়ি চাই, একটি গাড়ি থাকলে আরও দামী গাড়ি চাই। কিন্তু মৃত্যুর পর মাটির কবরে মানুষ কত সম্পদ রেখে এলো, তা দেখা হবে না। দেখা হবে সে তার সম্পদ দিয়ে ভালো কী কাজ করেছে।
তাই দুনিয়ার ধন-সম্পদকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে, একে আখিরাতের পাথেয় বা মাধ্যম বানানোই একজন বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ। নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা সুন্নাহ, কিন্তু অতিরিক্ত বিলাসিতার মোহে ডুবে যাওয়া আমাদের আত্মার জন্য খুবই বিপজ্জনক।
দুনিয়া আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা নয়, এটি কেবলই একটা পরীক্ষার হল। জীবনের মৌলিক প্রয়োজন (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) পূরণের পর আল্লাহ আমাদের যা কিছু অতিরিক্ত দিয়েছেন, সবই আসলে পরীক্ষা ও আমানত। তাই সম্পদের অহংকার না করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। ভোগের প্রতিযোগিতা না করে অভাবী মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হোন। তবেই আমাদের পরকালের পথ সহজ হবে।




