দেশের নাগরিকদের সরকারি সেবা প্রাপ্তি আরও সহজ, দ্রুত ও ভোগান্তিহীন করতে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এখন থেকে একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ধরনের সরকারি তথ্য ও সেবা থাকবে একটিমাত্র আইডির আওতায়। ফলে আলাদা আলাদা আইডি ব্যবহার করা বা বিভিন্ন দপ্তরে বারবার নতুন করে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার কোনো প্রয়োজন হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের চিন্তার ফসল ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগের আওতায় এটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। সরকারের পরিকল্পনায় থাকা এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নাগরিকদের জন্য একটি সিঙ্গেল ইউনিফায়েড আইডি চালু করা, যার মাধ্যমে ডিজিটাল ও ফিজিক্যাল উভয় ধরনের সরকারি সেবা সহজে গ্রহণ করা যাবে।
বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে এই মেগা প্রকল্প?
আইসিটি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বর্তমানে ড্রাফট বা ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) পর্যায়ে রয়েছে। ধারণাপত্রটি চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রকল্পের ধারণাপত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রধান ও আইসিটি বিভাগের যুগ্মসচিব মুজিবুর রহমান বলেন, “‘ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগটি এখন প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। একটি কনসেপ্ট পেপার তৈরি হয়েছে এবং এটি নিয়ে পরীক্ষা- নিরীক্ষা চলছে।”
তিনি আরও জানান, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য তথ্যসহ নাগরিকের সব ডেটাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনা। আইসিটি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই জুলাই মাস থেকেই প্রকল্পের মূল কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য রয়েছে এবং আগামী আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে এর রোলআউট বা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু হবে।
জন্মের পরই তৈরি হবে অনন্য এই ডিজিটাল আইডি
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের কোনো হাসপাতালে একটি শিশুর জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে যাবে। নবজাতকের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে শিশুটির জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য ডিজিটাল আইডি তৈরি করা হবে।
আর যেসব শিশু বাসায় জন্ম নেবে, তাদের জন্য আইডি তৈরির আলাদা বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। পরবর্তীতে এই একটিমাত্র আইডি নম্বরই ওই নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ভোটার তালিকাসহ সব ধরনের সরকারি ও ব্যক্তিগত কাজের লাইফলাইন হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে যেসব সরকারি ডাটাবেজ
এই প্রকল্পের আওতায় দেশের সব বড় বড় সেবা খাতকে একটি সিঙ্গেল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হলো:
- জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ
- জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও নির্বাচন কমিশন
- পাসপোর্ট অধিদপ্তর
- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য আইডি
- শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা ডাটাবেজ
- ভূমি সেবা ও রেজিস্ট্রি অফিস
- বিআরটিএ (BRTA) এবং বিটিআরসি (BTRC)
নাগরিকের অনুমতি ছাড়া তথ্য শেয়ার হবে না (কঠোর নিরাপত্তা)
সব তথ্য একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে জমা থাকায় সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে থাকলেও নাগরিকের ব্যক্তিগত অনুমতি (কনসেন্ট) ছাড়া কোনো তথ্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করা হবে না।
এটি দেশের ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন’ (পার্সোনাল ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট) এবং জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স আইনের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোথাও যদি আপনার শুধু বয়স যাচাই করার প্রয়োজন হয়, তবে আপনার পুরো ব্যক্তিগত প্রোফাইল নয়, বরং আপনার সম্মতির ভিত্তিতে শুধু বয়স সংক্রান্ত তথ্যটুকুই শেয়ার করা যাবে।
সাথে থাকবে ‘ডিজিটাল আইডি ওয়ালেট’
প্রকল্পের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি স্মার্টফোনভিত্তিক ‘ডিজিটাল আইডি ওয়ালেট’ সুবিধা থাকবে। এই ওয়ালেটে ব্যক্তির পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ক্রেডেনশিয়াল ও সরকারি সব সার্টিফিকেট বা ডকুমেন্ট ডিজিটাল উপায়ে সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশনে লগইন কিংবা পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল বা কাগজের আইডির বিকল্প হিসেবে এই মোবাইল ওয়ালেটটি ব্যবহার করা যাবে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি আপাতত কোনো পেমেন্ট বা আর্থিক লেনদেনের ওয়ালেট নয়, এটি মূলত আইডি ও ডকুমেন্ট ওয়ালেট। ভবিষ্যতে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি যুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
সিঙ্গাপুর ও এস্তোনিয়ার মডেল অনুসরণ
বিশ্বের যেসব দেশ প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে, তাদের মডেল অনুসরণ করেই তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের এই ইউনিফায়েড আইডি। আইসিটি বিভাগ জানিয়েছে, এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরের সফল ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি মডেল’ পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ সাইবার কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।
আপাতত এই পুরো উদ্যোগটি বিশ্বব্যাংক সমর্থিত ‘ডি-স্টার’ (D-STAR – Digital Service Transformation for Access and Resilience) প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার মূল কাজই হলো দেশের সরকারি ডিজিটাল সেবাগুলোকে আধুনিকায়ন করা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, আগামী মাস থেকেই দেশের প্রথম ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হবে, যার মূল ভিত্তিই হবে এই ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল আইডি’ কাঠামো। এই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সাধারণ মানুষের হয়রানি সম্পূর্ণ মুছে যাবে। সরকারের এই নতুন প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ সম্পর্কে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান। দেশের সব তাজা ও ইনফরমেটিভ খবর সবার আগে পড়তে আমাদের নিউজপেপার ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।




