বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে দেশের ‘কার্বন ক্রেডিট’ বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং এই বিষয়ে একটি শক্তিশালী কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে সংশ্লিষ্টদের সাথে বিশেষ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই উচ্চপর্যায়ের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দেশের পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব হাসান শিপলু এই বৈঠকের বিষয়ে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মূল নির্দেশনাগুলো কী কী?
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ কীভাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে বৈশ্বিক কার্বন বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে, তার ওপর জোর দেন। তার দেওয়া প্রধান নির্দেশনাগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক প্রযুক্তি: দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (যেমন সৌর বিদ্যুৎ বা বায়ু বিদ্যুৎ) ব্যবহার বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রয়োগ ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হবে।
- বন সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ: দেশের প্রাকৃতিকভাবে কার্বন শোষণ করার ক্ষমতা বাড়াতে বন রক্ষা করতে হবে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।
- স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার: কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার বা ডাটাবেজ গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।
- বিশেষ কমিটি গঠন: কার্বন ক্রেডিট অর্জনের লক্ষ্যটি দ্রুত ও সফলভাবে পূরণ করতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে কাজের মিল বা সমন্বয় জোরদার করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
কার্বন ক্রেডিট ও কার্বন ট্রেডিং আসলে কী?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই কার্বন ক্রেডিট এবং কার্বন ট্রেডিং বিষয়টি আসলে কী এবং এর মাধ্যমে কীভাবে লাভবান হওয়া যায়? চলুন এটি একদম সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক:
কার্বন ক্রেডিট (Carbon Credit) কী?
কার্বন ক্রেডিট হলো পরিবেশ সুরক্ষার জন্য তৈরি একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক বা মুদ্রা ব্যবস্থা। সহজ কথায়, বায়ুমণ্ডলে এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো কিংবা বায়ুমণ্ডল থেকে তা অপসারণ করার বিপরীতে একটি ‘কার্বন ক্রেডিট’ দেওয়া হয়। এটি এক ধরনের পরিবেশগত সার্টিফিকেট বা পুরস্কার।
কার্বন ট্রেডিং (Carbon Trading) বা কার্বন বাণিজ্য কী?
কার্বন ট্রেডিং হলো গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি আন্তর্জাতিক বাজারভিত্তিক কেনাবেচা ব্যবস্থা। এই নিয়মে বিশ্বমঞ্চে বা কোনো দেশে একটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের সীমা বা ‘ক্যাপ’ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
যদি কোনো ধনী দেশ বা বড় কোম্পানি সেই নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে ফেলে, তবে তাদের জরিমানা থেকে বাঁচতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ‘কার্বন ক্রেডিট’ কিনতে হয়।
বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হতে পারে?
যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান বেশি বেশি বনায়ন করে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমায় তারা প্রচুর কার্বন ক্রেডিট অর্জন করে। বাংলাদেশ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এবং কার্বন নিঃসরণ কম করে, তাই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা প্রচুর কার্বন ক্রেডিট জমা করতে পারব। পরবর্তীতে এই জমাকৃত ক্রেডিটগুলো অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী ধনী দেশ বা বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।
সভায় উপস্থিত মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে জানান, দেশে কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের কার্বন ক্রেডিট অর্জনের বিশাল সুযোগ তৈরি হবে।




