Thursday, July 16, 2026

উত্তরাঞ্চলের ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষকের ২২৬ কোটি টাকা ঋণ মওকুফ: খুশির হাওয়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে

বহুল পঠিত

উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বিশাল আনন্দের খবর এসেছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ২ লাখ ২৯ হাজার ৯৩৩ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ঋণের সম্পূর্ণ আসল ও সুদ মওকুফ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা এই ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে কৃষকদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) জনসংযোগ কর্মকর্তা ইফতেখার জাহিদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক ও স্বস্তিদায়ক তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। দেশের প্রথম বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে রাকাব সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় এই বিশাল পরিমাণ ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করল।

রাকাবের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ: ২২৬ কোটি টাকার ঋণ থেকে মুক্তি

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে সবসময় কাজ করে আসছে। এবারের ঋণ মওকুফের আওতায় বিপুল সংখ্যক কৃষকের কাছে ব্যাংকের আসল ও সুদ বাবদ পাওনা ছিল মোট ২২৫ কোটি ৭৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা (যা প্রায় ২২৬ কোটি টাকা)।

এই ঋণগুলোর বেশিরভাগই ছিল ‘মন্দ ঋণ’। অর্থাৎ, অভাব-অনটন ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে এই টাকা পরিশোধ করতে পারছিলেন না। ঋণের বোঝার কারণে অনেক কৃষক নতুন করে চাষবাস করার সাহস পাচ্ছিলেন না। সরকারের এই মানবিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে কৃষকরা এখন সম্পূর্ণ দায়মুক্ত হলেন।

কারা পাচ্ছেন এই সুবিধা এবং ঋণ মওকুফের নিয়মাবলী

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট নিয়মে ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন কৃষকরা এই সুবিধা পেলেন:

  • আসল ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত: যেসব ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আসল ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের পুরো আসল টাকা মওকুফ করা হয়েছে।
  • বকেয়া সুদ সম্পূর্ণ মাফ: আসল ১০ হাজার টাকার পাশাপাশি ওই ঋণের ওপর যত টাকা বকেয়া সুদ জমেছিল, তার পুরোটাও মাফ করে দেওয়া হয়েছে।
  • সীমা নির্ধারণ: সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, ১০ হাজার টাকার বেশি আসল ঋণ যারা নিয়েছেন, তারা এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আসেননি।

বিভাগ অনুযায়ী ঋণ মওকুফের বিস্তারিত হিসাব

উত্তরাঞ্চলের দুটি প্রধান বিভাগ রংপুর ও রাজশাহীর ১৬টি জেলার কৃষকরা এই সুবিধার আওতায় এসেছেন। রাকাবের জনসংযোগ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোন বিভাগে কতজন কৃষক উপকৃত হয়েছেন তার একটি পরিষ্কার হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

১. রংপুর বিভাগ

রংপুর বিভাগের আটটি জেলার কৃষকরা এই উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন। এই বিভাগের মোট ১ লাখ ৭৯ হাজার ২৭৮ জন প্রান্তিক কৃষকের ১৭৮ কোটি ৯২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।

২. রাজশাহী বিভাগ

রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার মোট ৫০ হাজার ৬৩৭ জন কৃষকের ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ঋণ ও সুদ মাফ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহযোগিতায় এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে। দুই বিভাগের ২ লাখ ২৯ হাজার ৯৩৩ জন কৃষকের বকেয়া ২২৫ কোটি ৭৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা সম্প্রতি সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রাকাবকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়। সরকারের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার পরপরই রাকাব কৃষকদের ঋণমুক্ত ঘোষণা করে।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদনে এর ইতিবাচক প্রভাব

দীর্ঘদিন ধরে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরছিলেন উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ প্রান্তিক চাষী। এই ঋণ মওকুফের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

  • নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ: ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হওয়ায় কৃষকরা এখন একদম নতুন করে কৃষিকাজে টাকা বিনিয়োগ করতে পারবেন। তাদের আর ব্যাংকের নোটিশ বা মামলার ভয়ে থাকতে হবে না।
  • কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি: টাকার অভাবে যারা জমি ফেলে রাখতেন বা ঠিকমতো সার-বীজ কিনতে পারতেন না, তারা এখন দ্বিগুণ উৎসাহে মাঠে নামবেন। এতে দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদন অনেক বাড়বে।
  • আর্থিক সক্ষমতার উন্নয়ন: গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষের হাতে এখন খরচের মতো টাকা থাকবে। ফলে গ্রামীণ বাজারগুলোতে বেচাকেনা বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা আরও সচল হবে।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা অত্যন্ত আশাবাদী যে, এই উদ্যোগের ফলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের এই বিশাল বকেয়া ঋণ ও সুদ মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রাকাবের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।

দেশের কৃষকদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া এই দারুণ উদ্যোগটি সফল করতে রাকাব অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কাজ করেছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সব ধরনের নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া মেনে খুব কম সময়ের মধ্যে এই কার্যক্রম শেষ করেছে।

ভবিষ্যতেও দেশের অন্নদাতা কৃষকদের পাশে থাকতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করতে রাকাব এ ধরনের কৃষিবান্ধব কর্মসূচি আরও নিয়ে আসবে বলে অঙ্গীকার করেছে।

অন্যান্য ব্যাংকেও শুরু হচ্ছে ঋণ মওকুফ প্রক্রিয়া

উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য শুধু রাকাবই নয়, আরও সুখবর রয়েছে। জানা গেছে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) দেখাদেখি দেশের অন্যান্য রাষ্ট্রায়াত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোও দ্রুত এই প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে।

যেসব ব্যাংক কৃষকদের ঋণ দিয়ে থাকে, তারাও এখন তাদের তালিকায় থাকা ঋণগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বকেয়া ঋণ ও সুদ মওকুফের কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকরাও খুব শীঘ্রই এই একই রকম বড় সুবিধা পেতে যাচ্ছেন।

সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেশের কৃষি খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং কৃষকদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন দেশের কৃষি সংশ্লিষ্ট সকল মহল।

আরো পড়ুন

তরুণদের জন্য সুখবর: মেধাবী উদ্যোক্তাদের ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা দেবে সরকার

দেশের তরুণ ও মেধাবী উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেল। নতুন কোনো ব্যবসা বা স্টার্টআপ শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন যারা, তাদের আর্থিক...

উপকূলীয় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে চমক: খুলনায় বিএডিসি’র ধঞ্চে চাষের নতুন দিগন্ত!

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং পরিবেশবান্ধব জৈব সবুজ সার উৎপাদনের লক্ষ্যে এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন...

ব্রেন ও স্পাইন চিকিৎসায় এক অনন্য ও সফল নক্ষত্র: নিউরোসার্জন ড. হাফিজ আসিফ রায়হান

চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল এবং সংবেদনশীল শাখা হলো নিউরোসার্জারি। যেখানে একটি সামান্য ভুল মানুষের জীবনকে চিরতরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে, সেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে,...
- Advertisement -spot_img

আরও প্রবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ প্রবন্ধ