মানুষ হিসেবে আমরা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নই। জীবনের নানা মোড়ে আমরা শয়তানের প্ররোচনায় বা নিজের দুর্বলতার কারণে গুনাহ বা পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলার দয়া ও রহমত অসীম। তিনি বান্দার গুনাহকে মানুষের সামনে প্রকাশ করে তাকে সমাজ বা পরিবারের কাছে লজ্জিত ও অপমানিত করেন না। তিনি পরম মায়ায় বান্দার পাপের ওপর পর্দা টেনে দেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে অনেকেই আল্লাহর এই বিশেষ নিয়ামত ও রহমতের মূল্য বোঝেন না। অনেকে নিজের করা গোপন পাপের কথা বন্ধুদের আড্ডায় বেশ রসিয়ে রসিয়ে গল্প করেন। আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুক ফুলিয়ে নিজের গুনাহের কথা প্রকাশ করেন। এই ধরনের মানুষদের ব্যাপারে ইসলামে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
কারা আল্লাহর সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবেন?
আমাদের প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এক শ্রেণির মানুষ আল্লাহর এই বিশাল ক্ষমার আওতা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবেন। তারা হলেন, যারা প্রকাশ্যে গুনাহ করে কিংবা নিজের গোপন গুনাহ মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়ায় (মুজাহিরিন)।
হাদিস শরিফে এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমার উম্মতের সকলেই ক্ষমা পাবে, তবে যারা প্রকাশ্যে গুনাহ করে (অথবা গুনাহ প্রকাশ করে) তারা ব্যতীত।”
এরপর আল্লাহর রাসুল (সা.) এই কাজের চমৎকার একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন:
“প্রকাশ্য গুনাহের একটি রূপ হলো কোনো ব্যক্তি রাতে একটি গুনাহ করল, আল্লাহ তা গোপন রাখলেন। কিন্তু সকালে সে নিজেই মানুষের কাছে গিয়ে বলে বেড়ায়— হে অমুক! গত রাতে আমি এই এই কাজ করেছি। অথচ সে রাত কাটিয়েছিল আল্লাহর দেওয়া পর্দার আড়ালে, আর সকালে নিজেই আল্লাহর সেই পর্দা খুলে ফেলল।” (সহিহ বুখারি ৬০৬৯, সহিহ মুসলিম ২৯৯০)
আল্লাহ কেন মানুষের গুনাহ গোপন রাখেন?
মহান আল্লাহ তাআলার একটি অন্যতম গুণ হলো ‘আস-সাত্তার’ বা গোপনকারী। তিনি বান্দার সম্মান রক্ষা করতে ভালোবাসেন। চিন্তা করে দেখুন, আমাদের প্রতিদিনের ছোট-বড় পাপগুলো যদি সাথে সাথে সবার সামনে প্রকাশ হয়ে যেত, তবে সমাজে কেউ কাউকে মুখ দেখাতে পারত না। পরিবার ও সমাজে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত।
আল্লাহ বান্দাকে সুযোগ দেন, সময় দেন যেন বান্দা লজ্জিত হয়ে ভুল বুঝতে পেরে তাঁর কাছে ফিরে আসে। আল্লাহ চান বান্দা তাঁর কাছেই ক্ষমা চাক, কিন্তু সে নিজের পাপের কথা মানুষের কাছে বলে বেড়াক এটি আল্লাহ মোটেও পছন্দ করেন না।
নিজের গুনাহ প্রকাশ করা কেন এত বড় অপরাধ?
যে ব্যক্তি নিজের করা পাপের কথা অন্যের কাছে বলে বেড়ায়, সে আসলে কত বড় ক্ষতি করছে তা নিজের অজান্তেই ভুলে যায়। নিজের গুনাহ প্রকাশ করার কারণে মূলত নিচের ক্ষতিগুলো হয়:
- আল্লাহর নিয়ামতের অবমূল্যায়ন: আল্লাহ যে দয়া করে তার পাপটি ঢেকে রেখেছিলেন, সেটির কোনো মূল্যই সে দিল না।
- পাপকে সাধারণ মনে করা: সমাজের মানুষের কাছে পাপ কাজটিকে সে অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে।
- অন্যদের উৎসাহিত করা: তার পাপের গল্প শুনে অন্য দুর্বল ঈমানের মানুষও সেই একই পাপ করতে উৎসাহিত হতে পারে।
- লজ্জাবোধ হারিয়ে ফেলা: বারবার নিজের পাপের কথা বলতে বলতে মানুষের মন থেকে পাপাচারের ভয় এবং লজ্জা একবারে দূর হয়ে যায়।
তওবার দরজা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি
আপনি যদি অতীতে কখনো এমন ভুল করে থাকেন, তবে আশাহত হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ তাআলা সুরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলেছেন:
“বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বান্দা যদি সত্যি মন থেকে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে, তবে আল্লাহর কাছে কোনো গুনাহই বড় নয়। তিনি সব মাফ করে দিতে পারেন।
ভুল হয়ে গেলে একজন মুমিনের করণীয় কী?
মানুষ হিসেবে চলার পথে ভুল বা গুনাহ হয়ে যেতেই পারে। তবে ভুল করার পর একজন সত্যিকারের মুমিন কখনো তা নিয়ে অহংকার করে না। বরং সে নিচের কাজগুলো করে:
- গুনাহ গোপন রাখা: নিজের পাপের কথা স্বামী, স্ত্রী, বন্ধু বা অন্য কারোর কাছেও প্রকাশ না করে গোপন রাখা।
- আন্তরিক তওবা করা: একান্তে চোখের জল ফেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- দৃঢ় সংকল্প করা: মনের ভেতর এই ইচ্ছা রাখা যে, এই গুনাহের কাজে আমি আর কখনোই ফিরে যাব না।
- নেক আমল বাড়িয়ে দেওয়া: বেশি বেশি ভালো কাজ ও দান-সদকা করা, যা পেছনের গুনাহকে মুছে দেয়।
মানুষের কাছে নিজের পাপের গল্প বলে বেড়ানোর চেয়ে, রাতের শেষভাগে সিজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে কাঁদলে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। আসুন, আমরা আমাদের গোপন পাপগুলোকে তওবার চোখের জল দিয়ে ধুয়ে ফেলি এবং আল্লাহর দেওয়া পর্দা অক্ষুণ্ন রাখি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি তওবা করার তৌফিক দিন। আমিন।




