বাংলাদেশ থেকে বিদেশের বাজারে পণ্য পাঠানো এবং বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল দেশে আনা সহজ করতে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও গতিশীল ও সুবিধাজনক করতে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা বিমানবন্দরসহ বাংলাদেশের সব বন্দর দিনে ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের স্বনামধন্য ও শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ এই বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা দেশবাসীকে জানানো হয়।
বৈঠকে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব ও সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি জানান, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ প্রধান বন্দরগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা (Twenty-four Hours Service) চালু রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
ব্যবসা ও বিনিয়োগের গতি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের এই দাবিটি প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। মাহদী আমিন বলেন:
“বেসরকারি খাতের প্রস্তাবনার পর প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে এ ব্যাপারে নির্দেশনা জারি করেন। সরকারের সকল সংশ্লিষ্ট দফতর ও বিভাগ মিলে সামনের দিনগুলোতে এটি নিশ্চিত করবে, যেন বাংলাদেশের প্রতিটি বন্দর ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদান করে। এর ফলে আমাদের পণ্য আমদানি ও রপ্তানি আরও দ্রুত এবং সুবিধাজনক হবে।”
বেসরকারি খাতের চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা
শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ এই বৈঠকে কেবল বন্দর চালু রাখাই নয়, বরং বেসরকারি শিল্প খাতের বিদ্যমান নানা জটিলতা ও সমস্যা নিয়েও খোলামেলা কথা হয়। দেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে কোন কোন দিকে নজর দেওয়া দরকার, তা নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে পথ খোঁজার চেষ্টা করেন।
বৈঠকে আলোচনার মূল দিকগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
- অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিনিয়োগ: দেশে বর্তমানে কাজ করা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)-র অধীন ইকোনমিক জোনগুলোতে কীভাবে বিপুল আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিনিয়োগ আনা যায়, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
- জটিলতা কমানো: শিল্প কারখানা ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতাগুলো কীভাবে দূর করে কাজ দ্রুত শেষ করা যায়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে ব্যবসায়ীদের মতামত শোনেন।
- বিভাগীয় প্রধানদের মতামত: বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানরা নিজস্ব মতামত ও বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল তুলে ধরেন।
তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থান এবং প্রো-বিজনেস বাজেট
সরকারের নীতিগত সহায়তার বিষয়ে মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য হলো দেশে এমন একটি সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ নীতিগত সহায়তা (Policy Support) পাবেন। সম্প্রতি ঘোষিত জনবান্ধব ও ব্যবসা-বান্ধব (Pro-Business, Pro-Investment) বাজেটের নীতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া হবে।
এই রূপান্তরের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ সমাজ এবং নারীদের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি করা।
প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক স্লোগান
প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর একটি বিশেষ অনুপ্রেরণামূলক বাণী উল্লেখ করে মুখপাত্র বলেন, প্রধানমন্ত্রী সর্বদা বিশ্বাস করেন—
“করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”
এই মূলনীতিকে হৃদয়ে ধারণ করে দেশের স্বার্থকে সর্বাদিক প্রাধান্য দিয়েই পুরো আলোচনাটি পরিচালিত হয়েছে। সরকারের এই ধরনের দ্রুত ও জনবান্ধব সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত বেসরকারি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিরা।
ব্যবসায়ীদের সন্তুষ্টি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা ও বন্দরের ধীরগতির কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলেন। বৈঠকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পলিসি সংক্রান্ত নানা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান ও আশ্বাস পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা চরম সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বন্দরগুলো প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলে পণ্য খালাস এবং বহির্বিশ্বে পণ্য জাহাজীকরণে যে সময় অপচয় হতো, তা বহুলাংশে কমে আসবে। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।




