বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি দারুণ ও আনন্দদায়ক খবর এসেছে। দেশের বেকার সমস্যা দূর করতে এবং তরুণদের স্বাবলম্বী করে তুলতে একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের ১৩টি প্রধান বড় শহরে ৫১ হাজারের বেশি বেকার তরুণ-তরুণীকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বিশাল কাজের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে প্রায় ৬৮৩ কোটি টাকা।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ইতোমধ্যে এই সংক্রান্ত একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে। প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে এই প্রকল্প চালু থাকবে।
এই সরকারি ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কী?
এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের শহরগুলোতে বাড়তে থাকা বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা। একই সাথে তরুণ-তরুণীদের নিজস্ব পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। শুধু চাকরি খোঁজা নয়, বরং তরুণরা যেন নিজেরা উদ্যোক্তা হতে পারেন এবং অন্যদের কাজের সুযোগ করে দিতে পারেন সেই পরিবেশ তৈরি করাই এই উদ্যোগের আসল উদ্দেশ্য।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক কাজ শেখানো হবে। এর ফলে তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে সহজে কাজ করতে পারবেন। ঘরের কোণে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার মাধ্যমে তারা দেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
প্রকল্প থেকে কী কী সুবিধা ও প্রশিক্ষণ পাওয়া যাবে?
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি সাধারণ কোনো ট্রেনিং হবে না। বর্তমান সময়ে বাজারের চাহিদা রয়েছে—এমন বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হবে।
প্রশিক্ষণে যা যা শেখানো হবে:
- প্রযুক্তিগত কাজ: সময়ের চাহিদাসম্পন্ন আইটি ও ডিজিটাল দক্ষতা।
- অনলাইন অ্যাকাউন্ট তৈরি: ফাইভার, আপওয়ার্কের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সুন্দর প্রোফাইল ও পোর্টফোলিও তৈরি।
- কাজ পাওয়ার কৌশল: কীভাবে সঠিক নিয়মে কাজের জন্য আবেদন (বিডিং) করতে হয়।
- বায়ারের সাথে যোগাযোগ: বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে সঠিকভাবে কথা বলা ও কাজ বুঝে নেওয়ার সহজ উপায়।
কর্মকর্তাদের লক্ষ্য হলো, প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই যেন একজন শিক্ষার্থী অনলাইনে আয় করা শুরু করতে পারেন।
বিনামূল্যে মিলবে ল্যাপটপ ও সনদ!
প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে একটি করে অফিশিয়াল সনদ বা সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, যাদের কাজের সরঞ্জাম কেনার আর্থিক সামর্থ্য নেই, প্রয়োজন অনুযায়ী সেসব প্রশিক্ষণার্থীকে ল্যাপটপ বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা দেওয়া হবে। এছাড়া কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘জব লিংকেজ’ ও মেন্টরশিপের ব্যবস্থা থাকবে, যেন ট্রেনিং শেষে কেউ ঝরে না পড়েন।
মেয়েরা কীভাবে উপকৃত হবেন?
আমাদের সমাজে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব অনেক। এই বিষয়টিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে সরকারের এই মেগা প্রকল্পে। মোট অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এর ফলে নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মেয়েরা বিনামূল্যে ফ্রিল্যান্সিং শিখে স্বাবলম্বী হতে পারবেন। ঘরে বসেই কাজ করার সুবিধা থাকায় অনেক নারী পারিবারিক দায়িত্ব সামলেও সহজে ভালো অঙ্কের টাকা আয় করতে পারবেন।
কেন সিটি করপোরেশন বা মহানগরে এই প্রশিক্ষণ?
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কেন এই প্রকল্প শহরের তরুণদের জন্য? যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) প্রিয়সিন্ধু তালুকদার বলেন, আমাদের দেশের চাকরির বাজার সীমিত। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে কাজ পাওয়া সম্ভব।
তিনি আরও জানান, ঢাকার মতো বড় বড় শহরে দেশের সব জেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা এসে পড়াশোনা বা কাজের জন্য থাকেন। ফলে সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করলে দেশের সব অঞ্চলের তরুণরাই এর সুফল পাবেন।
তিনি জানান, আগে ১৬টি জেলায় এই কাজ ছোট আকারে শুরু হয়েছিল। এরপর ৪৮টি ও পরবর্তীতে ৬৪টি জেলায় প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার মহানগরের তরুণদের আরও গভীরভাবে দক্ষ করতে ৬৮৩ কোটি টাকার এই বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হলো।
কারা পাবেন এই ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের সুযোগ?
এই প্রকল্পে অংশ নিতে খুব বড় কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ আপনাকে মাস্টার্স বা বড় ডিগ্রিধারী হতে হবে না।
যে যোগ্যতাগুলো লাগবে:
১. কম্পিউটারের বেসিক বা প্রাথমিক জ্ঞান থাকতে হবে।
২. নতুন বিষয় শেখার আগ্রহ এবং কাজের প্রতি সততা থাকতে হবে।
৩. বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
প্রশিক্ষণের মেয়াদ হবে ৩ মাস। এই তিন মাসকে দুটি ভাগে ভাগ করা হবে ‘বেসিক’ ও ‘অ্যাডভান্সড’। যারা বেসিক কোর্সে ভালো পারফর্ম করবেন, তাদেরকে উচ্চতর বা অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
কেন এখনই আমাদের তরুণদের দক্ষ করা জরুরি?
বর্তমানে বাংলাদেশ একটি বিশেষ সময় পার করছে। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ বা কর্মক্ষম। অর্থনীতিবিদরা একে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ শক্তির সুযোগ বলেন। কিন্তু এই সুযোগ চিরকাল থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩৩ থেকে ২০৪০ সালের পর আমাদের তরুণ দেশের তকমা কমতে শুরু করবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায়২৭ লাখের বেশি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন কাজের বাজারের পরিমাণ প্রায় ৪৫৫ বিলিয়ন ডলার!
যদি এখনই আমরা আমাদের কোটি কোটি তরুণকে গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা কনটেন্ট রাইটিংয়ের মতো কাজে দক্ষ করে না তুলি, তবে এই বিশাল সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই সরকারের এই ৬৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প আমাদের দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির মুখ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া বিদেশ না গিয়েও যে স্বাধীনভাবে ডলার আয় করা সম্ভব তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ফ্রিল্যান্সিং। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেশের লক্ষাধিক বেকারের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। আপনি যদি একজন তরুণ হন এবং ফ্রিল্যান্সিং করে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে ২০২৬ সাল থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশাল সুযোগের দিকে নজর রাখুন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত আপনাকেও বানিয়ে দিতে পারে একজন সফল ফ্রিল্যান্সার!




