ইসলামী আকিদা ও বিশ্বাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরকাল বা আখেরাত। আখেরাতের সবচেয়ে নির্ণায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হবে সেদিন, যখন বান্দার হাতে তার জীবনকালের হিসাবের খাতা বা আমলনামা তুলে দেওয়া হবে। কিয়ামতের কঠিন ময়দানে সকল মানুষের সামনে মহান আল্লাহর নির্দেশে এই আমলনামা খুলে ধরা হবে।
পবিত্র কোরআনে সুরা বনি ইসরাইলের ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।’
সেদিন যার আমলনামা ডান হাতে আসবে, তিনি হবেন চিরকালের জন্য সফল ও বিজয়ী। কোরআনের সুরা হাক্কাহ-তে এই চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, যাদের ডান হাতে হিসাবের খাতা দেওয়া হবে, তারা খুশিতে ও আনন্দে চিৎকার করে বলতে থাকবে ‘এসো, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো! আমি জানতাম আমাকে এই হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে।’ অতঃপর সে থাকবে এক পরম সন্তোষজনক সুউচ্চ জান্নাতে।
কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এমন ৬টি বিশেষ আমলের কথা নিচে তুলে ধরা হলো, যা নিয়মিত করলে হাশরের ময়দানে ডান হাতে আমলনামা পাওয়ার পথ সহজ হয়ে যাবে।
১. খাঁটি ও বিশুদ্ধ ইমানে অবিচল থাকা
কোরআনে ডান হাতে আমলনামাপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবানদের ‘আসহাবুল ইয়ামিন’ বা ডানদিকের দল বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো খাঁটি ইমান।
সুরা বালাদের ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়, যারা বিশুদ্ধ ইমান এনেছে… তারাই হলো ডান হাতে আমলনামাপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান দল।’
নবী করিম (সা.) হাদিসে স্পষ্ট করেছেন যে, এই ডানদিকের দলটি হাসিমুখে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সম্মানজনকভাবে তাদের ডান হাতেই আমলনামা সমর্পণ করা হবে (মুসনাদে আহমাদ: ৫৬৩৯)। তাই কোনো প্রকার শিরক বা বিদআতে লিপ্ত না হয়ে ইমানের ওপর শক্তভাবে টিকে থাকা সবচেয়ে জরুরি।
২. অন্যের দোষ গোপন রাখা ও আল্লাহর বিশেষ ক্ষমা লাভ
দুনিয়ার জীবনে যারা মানুষের ভুলত্রুটি বা দোষ গোপন রাখে, আখেরাতে আল্লাহ তাআলা তাদের পাপ গোপন রেখে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদের ডান হাতে হিসাবের খাতা দেবেন।
সহিহ বুখারির ২৪৪১ নম্বর হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর একজন মুমিন বান্দাকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে বিশেষ পর্দায় ঢেকে নেবেন। এরপর তাকে একটি একটি করে তার পাপের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। বান্দা অপরাধ স্বীকার করে নিজেকে ধ্বংসের মুখোমুখি ভাববে।
তখন দয়াময় আল্লাহ বলবেন, ‘আমি দুনিয়াতে তোমার এই পাপ গোপন রেখেছিলাম, আর আজ তা ক্ষমা করে দিলাম।’ এরপরই সেই বান্দার ডান হাতে নেক আমলের খাতা তুলে দেওয়া হবে।
৩. পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ যত্নসহকারে আদায় করা
কোরআনের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, ফরজ নামাজ সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও আদায়কারীরাই হবেন ডান হাতে আমলনামাপ্রাপ্ত দল।
সুরা মুদ্দাসসিরের ৩৮-৪৩ নম্বর আয়াতে জাহান্নাম ও জান্নাতবাসীদের মধ্যকার কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ডান হাতে আমলনামাপ্রাপ্তরা জান্নাতে থেকে অপরাধীদের জিজ্ঞেস করবে ‘কোন বিষয়টি তোমাদের দোজখে নিয়ে এল?’ অপরাধীরা জবাব দেবে ‘আমরা নিয়মিত নামাজ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না।’
এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, নিয়মিত ও সঠিকভাবে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়ার অভ্যাস আমাদের আসহাবুল ইয়ামিনের কাতারে দাঁড় করাবে।
৪. গোপনে দান-সদকা ও ক্ষুধার্তকে অন্নদান
ইসলামে দানশীলতাকে অত্যন্ত উঁচু মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। যারা কঠিন সময়ে গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ায় এবং গোপনে দান করে, আল্লাহ তাদের ডান হাতে আমলনামা দান করবেন।
সুরা বালাদের ১২ থেকে ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক ডানদিকের দলের সুনির্দিষ্ট কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দাসমুক্তি, দুর্ভিক্ষের দিনে ক্ষুধার্ত এতিম আত্মীয় বা ধূলিমলিন মিসকিনদের খাবার দান করা।
এ ছাড়া সহিহ বুখারির ১৪২৩ নম্বর হাদিসে এর গুরুত্ব বোঝাতে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া পাবেন সেই ব্যক্তি, যিনি এত গোপনে সদকা করেন যে তার বাঁ হাত জানতে পারে না ডান হাত কী দান করেছে।
৫. দৈনিক বেশি বেশি ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা
ডান হাতে আমলনামা পাওয়ার একটি মূল শর্ত হলো পাপমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন জীবন। আর মানুষের ভুলত্রুটি ও গুনাহ মুছে ফেলার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো তওবা ও ইস্তিগফার।
আল-মুজামুল আওসাত (হাদিস: ৮৩৯)-এ বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নিজের আমলনামা দেখে আনন্দিত ও প্রফুল্ল হতে চায়, সে যেন তাতে অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার যুক্ত করে।’
সুনানে ইবনে মাজার ৩৮১৮ নম্বর হাদিসেও বলা হয়েছে, যার আমলনামায় প্রচুর ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার আমল পাওয়া যাবে, তার জন্য রয়েছে চরম সুসংবাদ।
৬. মিজানের পাল্লা ভারী করে এমন জিকির ও তসবিহ পড়া
কেয়ামতের মাঠে মিজানে বা দাঁড়িপাল্লায় কার নেকের পাল্লা কতটুকু ভারী হলো, তার ওপর নির্ভর করবে আমলনামা কোন হাতে আসবে (সুরা কারিয়াহ: ৬-৭)। মিজানের পাল্লা সহজে ভারী করার মতো কিছু ছোট অথচ শক্তিশালী জিকির রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়ে গেছেন।
সহিহ বুখারির ৭৫৬৩ নম্বর হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘দুটি বাক্য এমন রয়েছে, যা মুখে উচ্চারণ করা খুবই সহজ, মিজানের পাল্লায় অত্যন্ত ভারী এবং পরম দয়াময় আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তা হলো:
‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।’
যিনি নিয়মিত এই জিকিরে জিহ্বা ভিজিয়ে রাখবেন, মিজানে তাঁর নেকের পাল্লা ভারী হবে এবং তিনি ডান হাতে আমলনামা লাভ করবেন।
আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনে সফলতা লাভ করাই একজন মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেদিন অনুশোচনা করে কোনো লাভ হবে না। তাই দুনিয়ার এই সংক্ষিপ্ত জীবনে ইমানকে মজবুত রাখা, ফরজ ইবাদত পালন করা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা এবং মানুষের সেবায় এগিয়ে আসার মাধ্যমেই আমরা ডান হাতে আমলনামা পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ‘আসহাবুল ইয়ামিন’ বা ডানদিকের দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।




