ইসলাম কেবল কতগুলো নির্দিষ্ট ইবাদত-বন্দেগির নাম নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও ভালোবাসাপূর্ণ সমাজ গঠনে স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজের ব্যস্ততা বা অহংকারের কারণে আমরা অনেক সময় আত্মীয়দের খোঁজখবর নিতে ভুলে যাই। অথচ ইসলামে স্বজনদের সাথে সদাচরণ করা এবং তাদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোকে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে যেন মানুষ তার সম্পর্কের সুতো কেটে না ফেলে।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোয় আত্মীয়তার গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা আত্মীয়-স্বজনের প্রাপ্য অধিকার আদায় করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন,
‘আর তোমরা নিকটাত্মীয়, মিসকিন ও মুসাফিরদের হক আদায় কর এবং কোনোভাবেই অপব্যয় কর না।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ২৬)
এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, আত্মীয়দের সহায়তা করা বা তাদের খোঁজ রাখা আমাদের জন্য কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার বা ‘হক’।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখাকে সরাসরি ঈমানের সাথে যুক্ত করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১৩৬)
অর্থাৎ, একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো সে কখনো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে না।
আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখার অভূতপূর্ব উপহার ও পুরস্কার
পবিত্র কুরআন ও হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যারা স্বজনদের সাথে হৃদ্যতা বজায় রাখেন, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখেরাতে বহুমুখী পুরস্কারে ভূষিত করেন। নিচে এর প্রধান সুফলগুলো আলোচনা করা হলো:
১. রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া
আমরা সবাই চাই আমাদের আয়ু দীর্ঘ হোক এবং জীবন-জীবিকায় বরকত আসুক। রাসুলুল্লাহ (সা.) রিজিক ও আয়ু বাড়ানোর অত্যন্ত সহজ একটি আমল আমাদের শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি নিজের রিজিক বৃদ্ধি হওয়া এবং আয়ু দীর্ঘ হওয়া পছন্দ করে, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)
আপনি যখন আপনার আত্মীয়দের পাশে দাঁড়াবেন, আল্লাহ তাআলা অদৃশ্য উপায়ে আপনার ধন-সম্পদে অলৌকিক বরকত দান করবেন।
২. সবচেয়ে দ্রুত সওয়াব লাভ
অন্যান্য নফল আমল বা ভালো কাজের প্রতিদান পেতে হয়তো কিছুটা সময় লাগতে পারে, কিন্তু আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার সওয়াব মহান আল্লাহ খুব দ্রুত বান্দাকে দান করেন।
হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,
‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা কর; কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার চেয়ে দ্রুত সওয়াব লাভ হয় এমন কোনো আমল নেই।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৫/১২৫)
৩. বিপদ-আপদ ও অপমৃত্যু থেকে রক্ষা
জীবন চলার পথে মানুষ নানাবিধ দুর্ঘটনা, কঠিন রোগ ও অপ্রত্যাশিত বিপদের মুখোমুখি হয়। হাদিসে এসেছে, স্বজনদের সাথে ভালো ব্যবহার মানুষকে এসব অশুভ পরিস্থিতি থেকে হেফাজত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,
‘নিশ্চয়ই সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে আল্লাহ আয়ু বৃদ্ধি করেন, অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করেন এবং অপ্রীতিকর ও আশঙ্কাজনক বিষয়াদি থেকে বাঁচিয়ে রাখেন।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা: ৪৪০৪)
৪. পারস্পরিক ভালোবাসা ও পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠা
স্বজনদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এবং বিপদে-আপদে এগিয়ে আসার মাধ্যমে পারিবারিক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। তিরমিজি শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে:
‘তোমরা তোমাদের বংশ পরিচয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখো, যাতে তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে পারো। কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা নিকটজনদের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টির মাধ্যম, ধন-সম্পদ বৃদ্ধি কারক এবং আয়ু দীর্ঘকারী।’ (তিরমিজি: ১৯৭৯)
যখন পরিবার ও আত্মীয়দের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ভালোবাসা তৈরি হয়, তখন পুরো সমাজেই এক স্বর্গীয় শান্তি নেমে আসে।
সম্পর্ক রক্ষায় আমাদের করণীয়
বর্তমান আধুনিক যুগে মোবাইল ও প্রযুক্তির কল্যাণে আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখা অনেক সহজ হয়ে গেছে। সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে আমরা নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারি:
- যোগাযোগ রাখা: প্রতিনিয়ত দূর-দূরান্তের আত্মীয়দের ফোন বা বার্তার মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া।
- বিপদে পাশে দাঁড়ানো: আত্মীয়দের মধ্যে কেউ আর্থিক বা মানসিকভাবে কষ্টে থাকলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা।
- ক্ষমাশীল হওয়া: অতীতে কেউ খারাপ ব্যবহার করে থাকলেও তা ভুলে গিয়ে আগে বাড়িয়ে সম্পর্ক জোড়া লাগানো।
- উপহার দেওয়া: যেকোনো উপলক্ষে আত্মীয়দের ছোটখাটো উপহার দেওয়া, এতে হৃদ্যতা বাড়ে।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচার বা লৌকিকতা নয়, বরং এটি দ্বীন ও দুনিয়া উভয় জগতে সফলতা অর্জনের এক মহামূল্যবান চাবিকাঠি। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সামান্য মেজাজ, হিংসা বা অহংকার ভুলে গিয়ে আমাদের উচিত নিজ দায়িত্বে আত্মীয়দের কাছে টেনে নেওয়া।




