আমাদের ব্যস্ত জীবনে ডায়াবেটিস এখন একটি অতি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল ওষুধ আর খাবার নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়, এর সাথে শারীরিক পরিশ্রমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে হলে জিমে গিয়ে অনেক ভারী ব্যায়াম করতে হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের কিছু সাধারণ অভ্যাসের মাধ্যমেই ডায়াবেটিস খুব সহজে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হাঁটাচলার গুরুত্ব কেন বেশি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন আমরা শারীরিক পরিশ্রম করি, তখন আমাদের পেশিগুলো শক্তি পাওয়ার জন্য রক্তে জমে থাকা অতিরিক্ত গ্লুকোজ ব্যবহার করে ফেলে। এর ফলে রক্তের শর্করার মাত্রা প্রাকৃতিকভাবে কমে যায় এবং শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই খুব বেশি ক্লান্তিকর কিছু না করে নিয়মিত সাধারণ হাঁটাচলা কিংবা হালকা ব্যায়াম করলে শরীর অনেক বেশি সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকে।
প্রতিদিন হাঁটার সঠিক নিয়ম
- অল্প সময় দিয়ে শুরু করুন: যারা নতুন ব্যায়াম শুরু করছেন, তারা প্রথমে প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করুন।
- ধীরে ধীরে সময় বাড়ান: শরীরের সহ্যক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে হাঁটার সময় ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট করতে পারেন।
- সঠিক জুতা নির্বাচন: হাঁটার সময় সবসময় আরামদায়ক জুতা পরুন, যাতে পায়ে কোনো আঘাত না লাগে।
২. নিজের পছন্দের ও সহজ ব্যায়াম বেছে নিন
ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমকে যদি আপনার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়, তবে তা নিয়মিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই এমন কিছু কাজ বেছে নিন যা করতে আপনার ভালো লাগে।
কোন ধরনের কাজ করতে পারেন?
- ঘরের মধ্যে হালকা মিউজিক চালিয়ে কিছুক্ষণ নাচতে পারেন।
- সময় পেলে পছন্দমতো সাইকেল চালাতে পারেন।
- সাঁতার কাটা বা ঘরে বসে সাধারণ স্ট্রেচিং করতে পারেন।
৩. ঘরের ছোটখাটো কাজেই রাখুন শারীরিক সক্রিয়তা
বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে বা বাইরে বৃষ্টি কিংবা খারাপ আবহাওয়া থাকলে মন খারাপ করার কিছু নেই। আপনি ঘরে বসেই আপনার দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে শরীর সক্রিয় রাখতে পারেন।
- সিঁড়ি ব্যবহার করুন: লিফটের পরিবর্তে সম্ভব হলে সবসময় সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করুন।
- বিজ্ঞাপনের সময় হাঁটুন: টেলিভিশন দেখার সময় বিরতিতে বা বিজ্ঞাপনের সময় ঘরেই একটু হেঁটে নিন।
- ছোটখাটো কাজ নিজে করুন: চা তৈরির সময় বা ঘরের ছোটখাটো কাজে নিজের পায়ে হেঁটে চলাফেরা করুন।
৪. হাতের কাছে থাকা জিনিস দিয়ে হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম
পেশির শক্তি বাড়ানোর জন্য জিমে গিয়ে ভারী লোহার ডাম্বেল তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। ঘরে থাকা সাধারণ জিনিসপত্র দিয়েই আপনি খুব সহজে আপনার পেশি সচল রাখতে পারেন।
- পানিভর্তি একটি ছোট প্লাস্টিকের বোতল হাতে নিয়ে হাতের সাধারণ কিছু ব্যায়াম করতে পারেন।
- ছোট ও হালকা কোনো পাত্র বা ওজন ছাড়া শুধু হাত-পায়ের স্ট্রেচিং করেও পেশি সচল রাখা যায়।
৫. ব্যায়ামের আগে ও পরে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন
যাঁরা নিয়মিত ইনসুলিন নেন কিংবা ডায়াবেটিসের নানা ধরনের ওষুধ খান, তাঁদের জন্য ব্যায়ামের সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ব্যায়াম শুরু করার আগে এবং ব্যায়াম শেষ করার পরে অবশ্যই একবার রক্তে শর্করার মাত্রা মেপে নেওয়া উচিত।
- কেন পরীক্ষা করবেন: এতে হঠাৎ করে রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার (Hypoglycemia) ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা যায়।
- জরুরি প্রস্তুতি: ব্যায়ামের সময় যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য সাথে সবসময় কিছু গ্লুকোজ বা মিষ্টি জাতীয় খাবার কাছে রাখুন।
৬. শারীরিক জটিলতা থাকলে কোন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলবেন?
ডায়াবেটিসের কারণে যদি আপনার শরীরে হৃদ্যন্ত্র, কিডনি কিংবা চোখের কোনো জটিল সমস্যা থাকে, তবে কখনোই অতিরিক্ত বা উচ্চমাত্রার ব্যায়াম করা যাবে না।
- ভারী কাজ বর্জন করুন: ভারী কোনো ওজন তোলা বা দ্রুত দৌড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
- ডাক্তারের পরামর্শ নিন: চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শুধুমাত্র আপনার শরীরের উপযোগী হালকা হাঁটা বা বসে করার মতো ব্যায়ামগুলো বেছে নিন।
৭. পায়ের সুরক্ষায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করুন
ডায়াবেটিস রোগীদের অনেক সময় পায়ে অসাড়তা বা অনুভূতি কিছুটা কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। তাই নিজের অজান্তেই পায়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- ব্যায়াম করার সময় সবসময় ভালো ও নরম সোলের জুতা ব্যবহার করুন।
- পায়ে যদি কোনো ধরনের অসাড়তা বা কাটা-ছেঁড়ার সমস্যা থাকে, তবে দৌড়ানোর মতো অতিরিক্ত চাপের ব্যায়াম করা থেকে দূরে থাকুন।
৮. শরীরের ক্লান্তি ও বিশ্রামের প্রতি যত্নশীল হোন
কোনো দিন যদি শরীর খুব বেশি ক্লান্ত লাগে কিংবা অসুস্থতাবোধ করেন, তবে সেদিন জোর করে কোনো ব্যায়াম বা ভারী কাজ করতে যাবেন না। শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন। যখন আপনার শরীর পুরোপুরি সুস্থ ও ঝরঝরে অনুভব করবে, তখন আবার নিয়মিত নিয়মে ফিরে যান।
ডায়াবেটিস মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মশৃঙ্খলার পাশাপাশি প্রতিদিনের জীবনে সামান্য কিছু শারীরিক পরিশ্রম ও এই আটটি নিয়ম মেনে চললে আপনিও থাকতে পারেন সম্পূর্ণ সুস্থ ও বিপদমুক্ত। তবে যেকোনো বড় রুটিন বদলানোর আগে অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নিয়মিত সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।




