জাপানের বিপক্ষে প্রথমার্ধে যখন গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ল ব্রাজিল, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সেলেসাও সমর্থকদের সামনে ভেসে উঠেছিল অতীতের সব বুকভাঙা হতাশার স্মৃতি। কারণ, পরিসংখ্যান বলছিল এক নির্মম সত্য গত ২৪ বছরে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একবার প্রথম গোল হজম করার পর আর কোনো ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়তে পারেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে এবার আর অতীতের সেই ভূত তাড়া করতে পারেনি তাদের। সব আক্ষেপ ও ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুর্দান্ত এক রূপকথা লিখেছে সেলেসাওরা। জাপানের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে এক নাটকীয় জয় তুলে নিয়ে ২০০২ সালের পর প্রথমবার নকআউটে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জয়ের এক অনন্য কীর্তি গড়ে দেখিয়েছে ব্রাজিল।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সর্বশেষ নকআউট পর্বে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ জেতার বা প্রত্যাবর্তনের গল্পটি ছিল ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া আসরে। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের তারকা মাইকেল ওয়েনের গোলে শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। তবে বিরতির ঠিক আগে রিভালদোর গোলে সমতা ফেরে এবং পরে রোনালদিনিওর সেই অবিস্মরণীয় দূরপাল্লার ফ্রি-কিক গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিল তারা। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ দুটি যুগ, কিন্তু নকআউটে প্রথমে গোল খেয়ে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সাম্বা বয়রা। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই বিরল প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে দেখাল ব্রাজিল।
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে ঘুরে দাঁড়ানোর গৌরবময় রেকর্ড
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রতিপক্ষের আগে গোল করার বা লিড নেওয়ার পরও ব্রাজিল এখন পর্যন্ত ১৫টি ম্যাচ নিজেদের করে নিয়েছে। এর মধ্যে ৭টি জয় এসেছে গ্রুপ পর্বে। বাকি জয়গুলো এসেছে নকআউট কিংবা তার পরবর্তী ধাপগুলোতে (যদিও ১৯৩৮ সালের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচও সেই তালিকায় রয়েছে)। ফলে সরাসরি নকআউটে কিংবা শিরোপার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনা সংখ্যায় কম হলেও, যে কটি ঘটেছে সেগুলো ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব ও আবেগ বহন করে।
ফাইনালে পিছিয়ে থেকেও শিরোপা জয়
ব্রাজিলের ঘরে থাকা পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফির মধ্যে দুটি ট্রফিই এসেছে এমন নাটকীয় এবং অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে:
- ১৯৫৮ সালের ফাইনাল: স্বাগতিক সুইডেন ম্যাচের শুরুতেই গোল করে এগিয়ে গিয়ে চমকে দিয়েছিল ব্রাজিলকে। তবে এরপর ফুটবল সম্রাট পেলে, ভাভা ও জাগালোর জাদুতে ৫-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল।
- ১৯৬২ সালের ফাইনাল: চার বছর পরের ফাইনালেও দেখা যায় একই চিত্র। চেকোস্লোভাকিয়া প্রথমে গোল দিয়ে লিড নিলেও আমারিল্ডো, জিতো ও ভাভার দুর্দান্ত গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় পরে সেলেসাওরা।
অতীত ইতিহাসের সোনালী পাতা ও ২০০২ পরবর্তী খরা
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস বেশ পুরোনো। এই পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৩৮ বিশ্বকাপেই। সে আসরে চেকোস্লোভাকিয়া ও সুইডেনের বিপক্ষে প্রথমে গোল হজম করেও শেষ পর্যন্ত জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল তারা। পরবর্তীতে ১৯৭০ এর বিখ্যাত বিশ্বকাপে চেকোস্লোভাকিয়া ও উরুগুয়ের বিপক্ষেও একইভাবে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় সাম্বার দেশ। এমনকি ১৯৮২ সালেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমে গোল খেয়েও শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল জিকো-সক্রেটিসদের সেই সোনালী দল।
তবে ২০০২ সালের পর থেকে নকআউট পর্বে প্রথম গোল হজম করলেই ভাগ্য যেন পুরোপুরি বেঁকে বসত ব্রাজিলের। ২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে, ২০১৪ সালের ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কাছে প্রথমে গোল হজম করে আর ম্যাচে ফিরতে না পেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। যদিও এই দীর্ঘ সময়ে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ২০০৬ সালে জাপান এবং ২০১৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জয় পেয়েছিল সেলেসাওরা, কিন্তু নকআউটের মঞ্চে তা যেন অলীক কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
যেভাবে এলো জাপানের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক জয়
জাপানের বিপক্ষে এই ম্যাচে অবশেষে ব্রাজিলের সেই দীর্ঘ দুই যুগের নকআউট বন্ধ্যাত্বের অবসান ঘটল। ম্যাচের প্রথমার্ধে জাপানি তারকা সানোর দুর্দান্ত এক গোলে পিছিয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। গোল খাওয়ার পর ব্রাজিলিয়ান শিবিরে যখন আবারও বিদায়ের শঙ্কা ভর করছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের দ্বিতীয়য়ার্ধে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে সেলেসাওরা।
খেলার মাঝে দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে প্রথমে কাসেমিরো গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। ১-১ সমতা নিয়ে ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ইনজুরি সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির এক অবিশ্বাস্য ও দুর্দান্ত গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো ব্রাজিল দল। এই জয়ের মাধ্যমে শুধু ম্যাচই জেতেনি তারা, বরং দুই যুগ পর বিরল প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে দেখাল ব্রাজিল।




