বর্তমানে সারা দেশে যখন বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং জ্বালানির দাম নিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চিন্তিত, ঠিক তখনই চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকায় র্যানকন গ্রুপ এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের সি-ফিশিং ডিভিশনে দেশের প্রথম সৌরশক্তি বা সোলার পাওয়ার চালিত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার চালু করেছে।
র্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে এই বিশাল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মূলত পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবসায়িক খরচ কমানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের খরচ ও উৎপাদন সক্ষমতা
র্যানকন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এই সোলার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। মাত্র দুই মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করে গত এপ্রিল মাস থেকে এটি পুরোদমে সচল হয়েছে।
এই সোলার সিস্টেমের উৎপাদন ক্ষমতা বেশ আশাব্যঞ্জক। এর সক্ষমতা ২৯৬ কেডব্লিউপি ডিসি এবং ২৫০ কিলোওয়াট এসি। চট্টগ্রামের সদরঘাটে অবস্থিত কোল্ড স্টোরেজের ভবনের প্রায় ২৮ হাজার বর্গফুট ছাদে এই প্যানেলগুলো বসানো হয়েছে। মোট ৪৮২টি সোলার প্যানেল দিনের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকারিতা
এই প্রকল্পে যে সোলার প্যানেলগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো বেশ বড় আকারের এবং উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন। প্রতিটি প্যানেলের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৩৮২ মিলিমিটার এবং প্রস্থ ১ হাজার ১৩৪ মিলিমিটার।
- স্বাভাবিক দিনে উৎপাদন: রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে প্রতিটি প্যানেল প্রায় ২.৮ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেয়।
- মেঘলা দিনে উৎপাদন: বৃষ্টির দিন বা মেঘলা আকাশ থাকলে উৎপাদন কিছুটা কমে ২.২ কিলোওয়াট-ঘণ্টায় দাঁড়ায়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এই কোল্ড স্টোরেজে ৫০০ টন মাছ সংরক্ষণ করা হয়। এই বিশাল পরিমাণ মাছ মাইনাস ১৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ লাগে। মজার ব্যাপার হলো, রোদেলা দিনে এই সোলার সিস্টেম হিমাগারের দিনের বেলার পুরো বিদ্যুতের চাহিদা একাই মিটিয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিলে বিশাল সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক সুফল
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে র্যানকনের পকেট থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ খরচ এখন অনেক কমে গেছে।
১. আগের বিল: সোলার সিস্টেম বসানোর আগে প্রতি মাসে বিল আসত প্রায় ৬.৭২ লাখ টাকা।
২. বর্তমান বিল: এখন বিল কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৫৯ লাখ টাকায়।
৩. মাসিক সাশ্রয়: অর্থাৎ প্রতি মাসে কোম্পানিটির ৪.১৩ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
এই সাশ্রয় শুধুমাত্র আর্থিক লাভ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। যেহেতু এই সোলার প্রজেক্টটি ২৫ বছর পর্যন্ত সেবা দেবে, তাই এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় র্যানকনের বিশেষ অবদান
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। র্যানকনের এই প্রকল্প বছরে প্রায় ২১০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করবে। বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বন ছাড়াই এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য বড় পাওয়া।
এছাড়া, যখন দিনের বেলা বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে, তখন বাড়তি বিদ্যুৎ নষ্ট হয় না। বরং সেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতেও ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
র্যানকন সি-ফিশিং ডিভিশনের বেইস ইঞ্জিনিয়ার সাদ্দাম হোসেন জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদিত বা সংরক্ষিত পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। সামুদ্রিক মাছ রপ্তানির ক্ষেত্রে পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। সোলার পাওয়ার ব্যবহারের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে। যেমন, দিনের বেলা সোলার কাজ করলেও রাতে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভর করতে হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমের উচ্চ আমদানিশুল্ক ও দাম। সরকার যদি এই শুল্ক কমায়, তবে এই খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।
চট্টগ্রামে র্যানকনের এই সৌরশক্তি চালিত কোল্ড স্টোরেজ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। যদি অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানও তাদের ভবনের ছাদে এভাবে সোলার প্যানেল স্থাপন করে, তবে দেশের বিদ্যুৎ সংকট অনেকাংশেই কমে যাবে। সরকারের উচিত আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমিয়ে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা।




