বাংলাদেশের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে (ইপিআই) আরও বেগবান করতে অনুদান হিসেবে প্রায় ৪ লাখ ডোজ পোলিও টিকা দিয়েছে চীনের শীর্ষস্থানীয় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশন’।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই টিকার চালান ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের হাতে এই টিকার নথিপত্র তুলে দেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সেলর লি সাওপোং এবং সিনোভ্যাক বায়োটেকের চিফ বিজনেস ডাইরেক্টর লি নিং।
টিকার পরিমাণ ও বর্তমান অবস্থা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই অনুদানের আওতায় সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশকে মোট ৭৬ হাজার ৬১৬টি ভায়াল সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৮০ ডোজ ইনঅ্যাক্টিভেটেড পোলিও ভ্যাকসিন (sIPV)।
ইতিমধ্যে এই টিকার বিশাল চালানটি নিরাপদে সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মূল সংরক্ষণাগারে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত এই ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে।
চীনের প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
টিকা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য চীন সরকার ও সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশনকে বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী বন্ধু হিসেবে চীন যে সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকে, এই অনুদানের মাধ্যমে তা আবারও প্রমাণিত হলো।”
স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উল্লেখ করে বলেন:
- টিকার ঘাটতি নেই: দেশে বর্তমানে হাম, ডেঙ্গু ও পোলিওসহ বেশ কিছু সংক্রামক রোগের ঝুঁকি থাকলেও পোলিও এবং যক্ষ্মার টিকার কোনো ঘাটতি নেই।
- হামের টিকাদান: ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় সব শিশুকে ইতিমধ্যে হামের টিকা দেওয়া শেষ হয়েছে এবং বাকি শিশুদেরও দ্রুত এই আওতায় আনা হবে।
- ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন: খুব শিগগিরই দেশজুড়ে নতুন করে ‘ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন’ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত টিকা
সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেডের চিফ বিজনেস ডাইরেক্টর লি নিং বলেন, “বাংলাদেশের শিশুদের পোলিও নির্মূল কার্যক্রমে অংশ নিতে পেরে আমরা অত্যন্ত গর্বিত।” তিনি জানান, সিনোভ্যাকের তৈরি এই বিশেষ পোলিও টিকাটি (sIPV) ২০২২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) কাছ থেকে প্রাক-যোগ্যতা বা ‘প্রি-কোয়ালিফিকেশন’ সনদ অর্জন করেছে। বৈশ্বিক পোলিও দূরীকরণের অংশ হিসেবে জাতিসংঘসহ (UN) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় সিনোভ্যাক নিয়মিত এই সফল ভ্যাকসিন সরবরাহ করে আসছে।
পোলিও নির্মূলে বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ অনেক আগেই পোলিও মুক্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এই ধারা বজায় রাখতে এবং নতুন করে যেন কোনো শিশু পোলিওতে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই উপহার দেশের স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে অনেকখানি স্বস্তি দেবে।
পরিশেষে বলা যায়, শিশুদের পোলিওমুক্ত ও সুস্থ রাখতে সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশনের এই ৪ লাখ ডোজ ভ্যাকসিনের অনুদান একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্বাস্থ্য খাতের এই সহযোগিতার মাধ্যমে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। দেশের প্রতিটি শিশু যেন সময়মতো এই টিকার আওতায় আসে, তা নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য।




