আজকাল চুল পড়া একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিরুনি চালালেই গোছা গোছা চুল উঠে আসা কিংবা ঘরের মেঝেতে চুলের মেলা দেখা এখন অনেকেরই প্রতিদিনের মাথাব্যথার কারণ। আমরা সাধারণত চুল পড়ার জন্য জিনগত কারণ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা বাজারের কেমিক্যালযুক্ত প্রসাধনীকে দায়ী করি। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমাদের প্রতিদিনের কিছু ছোট ছোট ভুল ও অসচেতনতা চুলের স্বাস্থ্যের ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলে?
অনেক সময় আমরা ভাবি যে চুলের অনেক যত্ন নিচ্ছি, তাও কেন চুল বেহাল হচ্ছে! আসলে অজান্তেই আমরা এমন কিছু বদভ্যাস গড়ে তুলি যা চুলের গোড়াকে দুর্বল করে দেয়। মানসিক চাপ ও খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি এই ভুলগুলোই চুল ঝরে পড়ার পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই দামি ট্রিটমেন্টের পেছনে টাকা খরচ করার আগে নিজের অভ্যাসগুলো শুধরানো জরুরি। চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন ৫টি ভুল এবং তা সমাধানের সহজ উপায়।
১. খুব শক্ত বা আঁটসাঁট করে চুল বাঁধা
গরম ও অতিরিক্ত ঘাম থেকে বাঁচতে অনেকেই মাথার চুল উঁচু করে এবং খুব শক্ত করে বেঁধে রাখেন। চারদিকে অনেকগুলো ক্লিপ বা শক্ত রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করেন যাতে এক গোছা চুলও মুখের ওপর না পড়ে। আবার অনেকের টান টান কেশসজ্জা বা হেয়ারস্টাইল পছন্দ।
ক্ষতি বা অপকারিতা
এভাবে দীর্ঘক্ষণ আঁটসাঁট করে চুল বাঁধলে চুলের গোড়ায় প্রচণ্ড টান পড়ে। এর ফলে চুলের ফলিকলগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং চুল মাঝখান থেকে ভেঙে বা ছিঁড়ে যেতে শুরু করে।
সমাধান:
- চুল বাঁধার সময় খেয়াল রাখুন যেন গোড়ায় অতিরিক্ত টান না লাগে। একটু আলগা বা ঢিলেঢালা করে চুল বাঁধুন।
- শক্ত প্লাস্টিক বা রাবারের ব্যান্ড চুলের শত্রু। এর পরিবর্তে সিল্কের কাপড়ের তৈরি নরম ‘স্ক্রাঞ্চি’ ব্যবহার করুন, যা চুলে টান লাগতে দেয় না।
২. শ্যাম্পু করায় অলসতা এবং ধুলোবালি জমা
অনেকেরই মাথা ধোয়া বা শ্যাম্পু করার ক্ষেত্রে এক ধরণের আলসেমি কাজ করে। আজ নয় কাল করতে করতে চুলের ত্বকে ময়লা জমতে দেওয়া একটি বড় ভুল অভ্যাস। বিশেষ করে আমাদের দেশের ভ্যাপসা ও গরম আবহাওয়ায় এই সমস্যা বেশি হয়।
ক্ষতি বা অপকারিতা
মাথায় নিয়মিত শ্যাম্পু না করলে ঘাম, বাইরের ধুলোময়লা, অতিরিক্ত তেল এবং মাথার ত্বকের মৃত কোষ জমতে থাকে। এগুলো চুলের ফলিকল বা গোড়ার ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে সেখানে প্রদাহ বা ইনফেকশন তৈরি হয় এবং চুল গোড়া থেকে আলগা হয়ে ঝরে পড়ে।
সমাধান
- অলসতা কাটিয়ে সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনবার ভালো শ্যাম্পু দিয়ে মাথা পরিষ্কার করুন।
- বাইরে থেকে এসে মাথা ঘেমে থাকলে ফ্যানের বাতাসে দ্রুত তা শুকিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
৩. ভেজা চুলের যত্ন ও চিরুনির ভুল ব্যবহার
গোসল বা মাথা ধোয়ার ঠিক পরপরই আমাদের চুল সবচেয়ে বেশি নরম ও স্পর্শকাতর অবস্থায় থাকে। এই সময়ে চুলের ওপরের প্রতিরক্ষামূলক আবরণ বা কিউটিকলগুলো অত্যন্ত দুর্বল থাকে।
ক্ষতি বা অপকারিতা
অনেকেই গোসল শেষ করেই গামছা বা তোয়ালে দিয়ে খুব জোরে জোরে মাথা ঘষেন। এতে দুর্বল চুল গোড়া থেকে উপড়ে আসে এবং চুলের আগা ফেটে যায়। এছাড়া ভেজা অবস্থায় সাধারণ চিরুনি দিয়ে জোর করে জট ছাড়াতে গেলেও প্রচুর চুল ছেঁড়ে।
সমাধান
- মাথা ধোয়ার পর আলতো হাতে নরম গামছা বা তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে বাড়তি পানি মুছে নিন। জোরে ঘষবেন না।
- ভেজা চুল কখনোই সরু দাঁতের চিরুনি দিয়ে আঁচড়াবেন না। চুল কিছুটা শুকানোর পর মোটা বা চওড়া দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন।
- আঁচড়ানোর সময় গোড়া থেকে শুরু না করে, প্রথমে চুলের নিচের দিকের জট আলতো করে ছাড়িয়ে নিন, তারপর ওপর থেকে আঁচড়ান।
৪. ভেজা মাথায় অতিরিক্ত তাপ বা স্ট্রেটনার প্রয়োগ
আজকাল পারফেক্ট লুক পাওয়ার জন্য অনেকেই ঘরে বসে চুল স্ট্রেইট বা ব্লো-ড্রাই করেন। তাড়াহুড়ো থাকলে অনেকেই ভেজা বা আধা-শুকনো চুলেই হিট বা তাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেন।
ক্ষতি বা অপকারিতা
ভেজা বা সিক্ত মাথায় গরম তাপ দিলে চুলের ভেতরের পানি স্ট্রেটনারের তাপে ফুটতে শুরু করে। পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘বাবল হেয়ার’ বলা হয়। এর ফলে চুলের কিউটিকল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চুল রুক্ষ ও প্রাণহীন হয়ে ভেঙে পড়ে।
সমাধান
- চুলে যেকোনো ধরণের হিট বা তাপ দেওয়ার আগে চুল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বাতাসে শুকিয়ে নিন।
- খুব প্রয়োজন না হলে চুলে অতিরিক্ত হিট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আর হিট ব্যবহার করলেও অবশ্যই আগে ‘হিট প্রটেক্টর’ সিরাম ব্যবহার করুন।
৫. মাথায় তেল মেখে সারারাত রেখে দেওয়া
চুলের পুষ্টির জন্য তেল মাখা অত্যন্ত উপকারী, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অনেকেই ভাবেন, মাথায় প্রচুর পরিমাণে তেল মেখে সারারাত রেখে দিলে চুল হয়তো বেশি পুষ্টি পাবে। এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়, বিশেষ করে গরমের দিনে।
ক্ষতি বা অপকারিতা
গরমের দিনে মাথায় ভারী তেল মেখে ঘুমাতে গেলে রাতে মাথার ত্বকে ঘাম ও তেল একসাথে মিশে যায়। এতে বাইরের ধুলোবালি আরও বেশি আকৃষ্ট হয়। ফলস্বরূপ চুলের গোড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মে চুল পড়ার হার বাড়িয়ে দেয়।
সমাধান
- ঘুমানোর আগে যদি তেল দিতেই হয়, তবে খুব হালকা তেল ব্যবহার করুন।
- সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হলো, শ্যাম্পু করার ১ থেকে ২ ঘণ্টা আগে চুলে ভালো করে তেল ম্যাসাজ করে নেওয়া। এতে চুলে ভাঙন ধরার ঝুঁকি কমে এবং চুলে প্রয়োজনীয় পুষ্টিও বজায় থাকে।
প্রাকৃতিকভাবে চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখার কিছু অতিরিক্ত টিপস
দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনের পাশাপাশি চুলের যত্নে নিচের সহজ ঘরোয়া টিপসগুলো মেনে চলতে পারেন:
১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন: চুলের গোড়া সতেজ রাখতে এবং মাথার ত্বককে হাইড্রেটেড রাখতে দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।
২. পুষ্টিকর খাবার খান: চুলে পুষ্টি ভেতর থেকে আসতে হয়। তাই খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, ভিটামিন ‘ই’ এবং আয়রন সমৃদ্ধ খাবার যেমন, ডিম, শাকসবজি, বাদাম ও ডাল রাখুন।
৩. রাসায়নিক বর্জন করুন: অতিরিক্ত কালারিং, রিবন্ডিং বা কড়া কেমিক্যালযুক্ত হেয়ার স্প্রে ব্যবহার করা সাময়িকভাবে সুন্দর লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে চুলের চরম ক্ষতি করে।
চুল আমাদের সৌন্দর্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দামি প্রসাধনী ব্যবহারের চেয়েও বেশি প্রয়োজন চুলের সঠিক যত্ন এবং ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো বর্জন করা। উপরে উল্লেখিত সাধারণ ভুলগুলো এড়িয়ে চললে এবং পুষ্টিবিদ ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চুলের যত্ন নিলে চুল পড়া অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। আজই আপনার বদভ্যাসগুলো পরিবর্তন করুন এবং আপনার চুলকে রাখুন প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়।




