আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা ঝাল ছাড়া খাবার যেন মুখে তুলতেই পারেন না। আবার অনেকের কাছে সামান্য ঝাল মানেই মুখে যেন আগুন লেগে যাওয়া! মিষ্টিপ্রেমীদের সংখ্যা যেমন কম নয়, তেমনি ঝালপ্রিয় মানুষের সংখ্যাও বিশ্বজুড়ে বিশাল।
তবে একটা বিষয় খেয়াল করেছেন কি? ঝাল খাবার খাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের মুখে জ্বালাপোড়া শুরু হয়, শরীরে গরম অনুভূত হতে থাকে এবং অনেকের কপাল থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরতে শুরু করে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ঝাল খেলেই কেন আমাদের এমন গরম লাগে? এটি কি কেবলই একটি অনুভূতি, নাকি সত্যিই ঝাল খেলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়?
চলুন, খুব সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক ঝাল লাগার পেছনের বিজ্ঞানভিত্তিক আসল কারণ।
গরম লাগার আসল অপরাধী: ক্যাপসাইসিন (Capsaicin)
ঝাল খাবার খেলেই যে শরীরে গরমের অনুভূতি তৈরি হয়, তার পেছনে দায়ী মরিচে থাকা একটি বিশেষ রাসায়নিক উপাদান। এর নাম ‘ক্যাপসাইসিন’ (Capsaicin)। মূলত ‘ক্যাপসাইসিনয়েড’ নামক সমধর্মী কিছু যৌগের মধ্যে এটি অন্যতম প্রধান একটি উপাদান।
যখন আমরা ঝালযুক্ত বা মরিচ দেওয়া কোনো খাবার খাই, তখন এই ক্যাপসাইসিন উপাদানটি আমাদের মুখ এবং জিহ্বায় স্পর্শ করে। জিহ্বায় থাকা বিশেষ কিছু স্নায়ুকোষ বা রিসেপ্টর এই উপাদানের মুখোমুখি হতেই এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া শুরু করে।
মস্তিষ্ক যেভাবে বিভ্রান্ত হয়: ভ্যানিলয়েড রিসেপ্টরের খেলা
আমাদের মুখ এবং জিহ্বায় তাপমাত্রা শনাক্ত করার জন্য এক ধরনের স্নায়ুকোষ থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ভ্যানিলয়েড রিসেপ্টর’ (Vanilloid Receptor)। সাধারণ অবস্থায় শরীরের কোথাও অতিরিক্ত তাপ লাগলে এই রিসেপ্টরগুলো মস্তিষ্ককে সতর্ক করে দেয়।
কিন্তু আমরা যখন ঝাল খাবার খাই, তখন মরিচের ক্যাপসাইসিন এই ভ্যানিলয়েড রিসেপ্টরগুলোর সাথে ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন শুরু করে। ক্যাপসাইসিনের ঝাঁজালো উপস্থিতি রিসেপ্টরগুলোকে চরমভাবে উত্তেজিত করে তোলে।
এর ফলে যা ঘটে, তা বেশ মজার:
- ভুল সংকেত প্রেরন: রিসেপ্টরগুলো ক্যাপসাইসিনের এই ঝাঁজকে আসল ‘তাপ বা গরম’ হিসেবে ভুল শনাক্ত করে।
- মস্তিষ্কের বিভ্রান্তি: রিসেপ্টরগুলো সাথে সাথে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় যে শরীরে তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে!
- প্রকৃত ঘটনা: প্রকৃতপক্ষে কিন্তু ঝাল খাওয়ার ফলে আপনার শরীরের ভেতরের আসল তাপমাত্রা একটুও বাড়ে না। মস্তিষ্ক কেবল এক ধরনের বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া সংকেতের শিকার হয়।
সহজ কথায়, মস্তিষ্ক মনে করে আপনার শরীর গরম হয়ে গেছে, আর তাই সে শরীরকে ঠাণ্ডা করার জন্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘাম বের করতে শুরু করে!
ঝাল খাবারের কিছু আকর্ষণীয় সুবিধাও রয়েছে!
ঝাল খেলেই যে শুধু জ্বালাপোড়া আর গরম লাগে তা নয়, এই ঝাল খাবারের কিন্তু বেশ কিছু চমকপ্রদ স্বাস্থ্যগত ব্যবসাও রয়েছে:
১. ভাত বা শুকনো খাবার গিলতে সাহায্য করে
ঝাল খাবার মুখে যাওয়ার সাথে সাথেই মুখে লালা বা স্যালাইভা নিঃসরণের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত লালা ভাতের মতো শুকনো খাবার সহজে গিলতে দারুণ সাহায্য করে।
২. প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে
বিজ্ঞানের একটি তত্ত্ব মতে, ঝাল খাওয়ার ফলে শরীরে যে গরম অনুভূত হয়, তা প্রতিরোধ করতে মস্তিষ্ক ‘এন্ডোরফিন’ (Endorphin) নামক একটি বিশেষ হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। এই এন্ডোরফিন হরমোনটি মানবদেহে প্রাকৃতিক ব্যথানাশক বা পেইনকিলার হিসেবে কাজ করে। ফলে ঝাল খাওয়ার পর এক ধরনের মানসিক আরাম বা তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি হয়।
৩. চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহার
ক্যাপসাইসিনের চমৎকার ব্যথানাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই উপাদানটি আবিষ্কারের পর থেকেই মূলত পোড়া ক্ষতের ব্যথা উপশমে এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা হয়ে আসছে। এটিকে বলা যায় অনেকটা ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’-র মতো কৌশল! এর নিজস্ব তীব্র জ্বালাপোড়ার অনুভূতি শরীরের অন্য যেকোনো ভেতরের ব্যথার অনুভূতিকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত ঝাল কি সবার জন্য ভালো?
মানুষভেদে ঝাল সহ্য করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ আলাদা। কারো কাছে যে ঝাল সামান্য মনে হয়, অন্যের কাছে তা অসহ্য ঠেকতে পারে।
অতিরিক্ত ঝাল খেলে হজমের সমস্যা, পেটে জ্বালাপোড়া বা আলসারের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই আপনার শরীর যতটুকু ঝাল সহ্য করতে পারে, ঠিক ততটুকুই খাওয়া উচিত। কাউকে দেখে বা জোর করে অতিরিক্ত ঝাল খাবার খাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ঝাল খাবার খেলে গরম লাগার পুরো বিষয়টিই মূলত আমাদের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের এক দারুণ মজার বিভ্রান্তি। মরিচের ‘ক্যাপসাইসিন’ উপাদানটি আমাদের শরীরকে সাময়িকভাবে বোকা বানালেও, পরিমিত পরিমাণে ঝাল খাবার কিন্তু স্বাদের পাশাপাশি শরীরের জন্য বেশ তৃপ্তিদায়ক। তাই নিজের সহ্যক্ষমতা বুঝে পরিমিত ঝাল উপভোগ করুন এবং সুস্থ থাকুন!




