বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এবং সমালোচিত ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) ২০২৩’ চিরতরে বিলুপ্ত ঘোষণা করে সরকার কার্যকর করেছে ‘ সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ ’। এই পরিবর্তনটি কেবল একটি আইন সংশোধন নয়, বরং বাংলাদেশের ডিজিটাল স্পেসে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি বড় অঙ্গীকার।
গত ২১ মে ২০২৫ তারিখে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি কার্যকর হয়। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও ডিজিটাল জনসেবাকে নিরাপদ করতে এই আইনের কঠোর কিন্তু ন্যায়নিষ্ঠ প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন।
কেন এই পরিবর্তন? একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ইতিহাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) এবং পরবর্তীকালে সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) নাগরিক সমাজের কাছে ‘কালো আইন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। মতপ্রকাশের কারণে সাংবাদিক, লেখক ও সাধারণ নাগরিকদের হয়রানির অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে এই আইনটি পুরোপুরি বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ রহিত করার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগের আইনটিতে নাগরিক সুরক্ষার বিধান ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল, যা নিপীড়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করত।
১. বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের অগ্রযাত্রা
নতুন এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। আগের আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো (যেমন: মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, বা রাজনৈতিক সমালোচনা) থেকে ফৌজদারি সাজার বিধান প্রায় সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে সত্য তথ্য প্রকাশ বা গঠনমূলক সমালোচনার জন্য কোনো নাগরিককে সাইবার আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়তে হবে না।
২. আমূল পরিবর্তন: ৯৫% রাজনৈতিক ও মতপ্রকাশের মামলা বাতিল
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকার একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগের আইনের অধীনে কেবল রাজনৈতিক বা বাকস্বাধীনতার কারণে করা প্রায় ৫,০০০ মামলা বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি বিশাল মুক্তি বা ‘Blanket Amnesty’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন নির্দ্বিধায় সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের মতামত শেয়ার করতে পারছেন।
৩. জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি ও কাউন্সিল গঠন
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠন করেছে। এই কাউন্সিলটি ২৫ সদস্যের এবং এর প্রধান স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হবে রাজনৈতিক দমন নয়, বরং হ্যাকিং, ডিজিটাল জালিয়াতি এবং জাতীয় তথ্য পরিকাঠামো (CII) রক্ষা করা। ইতোমধ্যে ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
৪. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আধুনিক অপরাধ মোকাবিলা
যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রথমবারের মতো এই অধ্যাদেশে এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। এআই ব্যবহার করে হ্যাকিং, ডিপফেক ভিডিও বা ডিজিটাল জালিয়াতি করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষকে অপরাধী যেন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য আইনটিকে অত্যন্ত আধুনিক ও শক্তিশালী করা হয়েছে।
৫. নির্বাচনে সাইবার নিরাপত্তা ও গুজব প্রতিরোধ
২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই অধ্যাদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন যে, নির্বাচনের সময় কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে গুজব ছড়াতে না পারে। নির্বাচন কেন্দ্রিক সাইবার অপরাধ দমনে বিটিআরসি (BTRC) এবং সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি সমন্বয় করে কাজ করবে।
৬. আর্থিক জালিয়াতি ও হ্যাকিংয়ে জিরো টলারেন্স
ব্যাংকিং খাত এবং ই-লেনদেনকে নিরাপদ করতে এই আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি কম্পিউটার সিস্টেম বা ডিজিটাল ডিভাইসে বেআইনি প্রবেশ বা হ্যাকিং করেন, তবে অপরাধভেদে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এটি বিনিয়োগকারী ও সাধারণ গ্রাহকদের অনলাইন লেনদেনে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।
৭. মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে কঠোর আইন
আগের আইনে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ‘হয়বামূলক মামলা’। নতুন অধ্যাদেশের ২৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে বা অন্য কাউকে হয়রানি করার জন্য মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের করে, তবে অভিযোগকারীকেই ওই অপরাধের জন্য নির্ধারিত সাজা ভোগ করতে হবে। এই বিধানটি আইনটির অপব্যবহার রোধে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
৮. ডিজিটাল জনসেবায় সুরক্ষা
সরকার বর্তমানে নাগরিকদের অধিকাংশ সেবা অনলাইন বা ডিজিটাল ফরমেটে নিয়ে আসছে। এই ডেটাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘উপাত্ত-ভান্ডার’ (Data Bank) সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি বা অপব্যবহার করলে এখন থেকে কঠোর আইনি ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হবে।
উপসংহার: ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ
‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ কেবল একটি আইন নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিশন। এটি নাগরিকদের ভয়মুক্ত রাখে এবং অপরাধীদের জন্য কঠোর বার্তা দেয়। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, আইনটির সঠিক বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করবে।
সুত্রঃ সাইবার সুরক্ষা সরকারী ওয়েবসাইট