দেশের সাধারণ মানুষ ও সীমিত আয়ের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এক বিশাল উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিনের নানা প্রস্তুতি ও সফল পরীক্ষার পর অবশেষে আগামী ১৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। সরকারের এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের প্রতিটি যোগ্য ও দরিদ্র পরিবারের কাছে সরকারি ভাতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া।
বর্তমানে অনেক পরিবারেই আর্থিক টানাপোড়েন লেগে থাকে। ঠিকমতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কিংবা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানো অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার চাচ্ছে, এই কার্ডের মাধ্যমে অন্তত দেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর একটি বড় সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। আগামী চার বছরের মধ্যে সারা দেশের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে কোথায় কোথায় চালু হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড?
পুরো দেশে একযোগে বড় একটি প্রকল্প চালু করতে গেলে অনেক সময় মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রথম চালুর পর মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি দেখে নিয়ে আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়নে একযোগেই এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে। সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
পাইলট প্রজেক্টের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি
কোনো বড় কর্মসূচি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার ভালো-মন্দ পরীক্ষা করে নেওয়া খুব জরুরি। সরকারও ঠিক সেই পথেই হেঁটেছে। দেশের ৫৬টি নির্দিষ্ট এলাকায় পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক কাজ পরিচালনা করা হয়েছিল। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এই ৫৪টি এলাকায় কাজের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ইতিবাচক ও সফল ছিল।
যদিও যশোর ও নেত্রকোনার দুটি নির্দিষ্ট এলাকায় তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তবে সরকার দ্রুত তা চিহ্নিত করে সংশোধন করেছে। বাকি ৫৪টি এলাকায় তথ্যের কোনো বড় ধরনের ভুল মেলেনি এবং ত্রুটির হার ছিল ৩ শতাংশেরও কম। এই ইতিবাচক ফল দেখার পরই সরকার সাহসের সঙ্গে সারা দেশে একযোগে এটি শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কীভাবে হবে তথ্য সংগ্রহ ও আবেদন প্রক্রিয়া?
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে কীভাবে তথ্য দেওয়া হবে বা ভুল তথ্য দিয়ে কেউ সুবিধা হাতিয়ে নেবে কি না। এবার সেই সুযোগ একদম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আগামী ১৬ আগস্ট থেকেই সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক নতুন প্রশ্নমালা ও আধুনিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এটি অত্যন্ত গতিশীল। অর্থাৎ, প্রতি মাসে তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ বা আপডেট করা হবে। এর ফলে যদি কোনো সুবিধাভোগীর মৃত্যু হয়, কারো আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয় বা কোনো নতুন পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে আসে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য সিস্টেমে যুক্ত হয়ে যাবে। এতে করে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা কখনোই সরকারি সুবিধা পাওয়া থেকে বাদ পড়বেন না।
- অনলাইন তথ্য সংগ্রহ: সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক স্বচ্ছ ডেটাবেজ প্রস্তুত করা।
- স্বয়ংক্রিয় হালনাগাদ: প্রতি মাসে পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক তথ্য আপডেট করা।
- নিরপেক্ষ বণ্টন: রাজনীতি, ধর্ম বা দলের বাইরে গিয়ে কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে কার্ড দেওয়া।
- কড়া তদারকি: দুর্নীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তিন স্তরের শক্ত মনিটরিং।
দুর্নীতি বন্ধে তিন স্তরের তদারকি ব্যবস্থা
অতীতের বিভিন্ন ভাতা বা কার্ড বিতরণে নানা ধরনের স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়ই শোনা যেত। কিন্তু এবারের ফ্যামিলি কার্ডে সেই ফাঁকফোকর পুরোপুরি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে অত্যন্ত কড়া ৩ স্তরের মনিটরিং বা তদারকি ব্যবস্থা:
- ইউনিয়ন পর্যায়: ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের পুরো কাজটি তদারকি করবেন একজন প্রথম শ্রেণির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।
- উপজেলা ও জেলা পর্যায়: উপজেলা পর্যায়ে স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সরাসরি নেতৃত্বে মনিটরিং কমিটি কাজ করবে।
- বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়: বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে এবং জাতীয় পর্যায়ে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠিত হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে নিয়মিত বিরতিতে এই কর্মসূচির মূল অগ্রগতি তদারকি করবেন। ফলে ভুয়া নাম দিয়ে কার্ড হাতিয়ে নেওয়ার কোনো পথ আর খোলা থাকছে না।
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, গুরুত্ব পাবে মানবিক অধিকার
ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে কোনো সাধারণ মানুষের মনে যেন ক্ষোভ বা ভয় না থাকে, সে ব্যাপারে সরকার অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই কার্ড বণ্টনে মানুষের ধর্ম, গোত্র বা রাজনৈতিক পরিচয় বিন্দুমাত্র বিবেচনায় আনা হবে না।
একজন মানুষ সত্যি সত্যিই সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য কি না কেবল এটিই হবে একমাত্র মাপকাঠি। একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কোনো দলীয় পক্ষপাত ছাড়া সাধারণ ও অসচ্ছল নাগরিকের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকার শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নারীর ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যে আর্থিক সহায়তা বা ভাতা আসবে, তা সরাসরি পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহিণীদের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গবেষক ও সমাজকর্মীদের মতে, এটি সরকারের সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্তগুলোর একটি।
সাধারণত পরিবারের নারী সদস্যদের হাতে টাকা পৌঁছালে তারা সেই অর্থ সংসারের জরুরি কাজে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগান। যেমন:
১. সন্তানদের শিক্ষার খরচ ও বই-খাতা কেনা।
২. শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার কেনা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৩. হাঁস-মুরগি পালন, ফলজ ও ভেষজ গাছ লাগানো।
৪. গৃহস্থালি কুটির শিল্প, সেলাই কাজ এবং ছোটখাটো উদ্যোগের মাধ্যমে আয় বাড়ানো।
এর ফলে একদিকে যেমন গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাবে, ঠিক তেমনি গ্রামের সার্বিক দারিদ্র্য কমাতেও এটি এক বিপ্লব তৈরি করবে।
আগামী ১৬ আগস্টের পর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কেবল সাধারণ কোনো সরকারি ভাতা নয়, বরং বাংলাদেশের সাধারণ ও অসচ্ছল মানুষগুলোর আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এক নতুন স্বপ্ন। সঠিক তথ্য ও স্বচ্ছতা বজায় থাকলে এটি দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




