দেশের কোনো শিশুই যেন টিকাদান কর্মসূচির বাইরে না থাকে, সে লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। সারাদেশে চলমান হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে রেকর্ড সংখ্যক দুই কোটি শিশুকে সফলভাবে টিকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ অর্জনেই থেমে থাকছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। দেশের প্রতিটি শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে আগামী এক মাসের মধ্যে আরও প্রায় ৩৫ লাখ শিশুকে এই টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত।
তিনি জানান, দেশের প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলসহ বাদ পড়ে যাওয়া প্রতিটি শিশুর দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সরকার বদ্ধপরিকর।
স্বাস্থ্য খাতের পুনর্গঠন ও সরকারের অগ্রাধিকার
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রূপরেখা ও সার্বিক লক্ষ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার ক্ষেত্রে যে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবিলায় নতুন সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী রহমানের দিকনির্দেশনায় ও নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, কেবল চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোই নয়, রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম এবং জনগণের সার্বিক কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে টিকাদান কর্মসূচিগুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করতে বিশেষ ‘মপ-আপ’ ক্যাম্পেইন
দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধে সরকার যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সুফল পেতে শুরু করেছে দেশের মানুষ।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ইতোমধ্যে দুই কোটি শিশুকে সফলভাবে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা সেখানে থেমে নেই, কারণ আমাদের কাছে দেশের প্রতিটি শিশুর জীবনই সমান মূল্যবান।”
একটি শিশুও যেন টিকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে সরকার এই বিশেষ কার্যক্রমটিকে ‘মপ-আপ ক্যাম্পেইন’ (Mop-up Campaign) হিসেবে পরিচালনা করছে।
কাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে?
এই মপ-আপ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিম্নলিখিত শিশুদের শনাক্ত করবেন:
- দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিশু: পাহাড়ি এলাকা, হাওর ও চরাঞ্চলের বসবাসকারী শিশু।
- বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) শিশু: যাদের কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়া কঠিন।
- আগের ধাপে বাদ পড়া শিশু: কোনো কারণে যারা প্রথম ধাপের টিকা ক্যাম্পেইনে অংশ নিতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীদারদের সহযোগিতা
সারাদেশে এই বিশালাকার টিকাদান কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করার পেছনে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, সরকার একা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সহযোগীদের হাত ধরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করছে। বিশেষ করে নিচের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান অনস্বীকার্য:
- যুক্তরাষ্ট্র সরকার (US Government)
- গ্যাভি (GAVI – Global Alliance for Vaccines and Immunization)
- ইউনিসেফ (UNICEF)
- ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষ
- দেশজুড়ে কর্মরত মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীগণ
প্রতিমন্ত্রী সকল অংশীদার ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “তাদের নিরলস পরিশ্রমের কারণেই আমরা দুর্গম পাহাড় ও চরাঞ্চলেও টিকা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি।”
কেন শিশুদের জন্য হাম-রুবেলার টিকা অত্যন্ত জরুরি?
হাম ও রুবেলা দুটিই অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শিশুদের জন্য বেশ বিপজ্জনক হতে পারে। সময়মতো টিকা দেওয়া না হলে শিশুরা জটিল শারীরিক সমস্যায় পড়তে পারে।
- হামের ঝুঁকি: তীব্র জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার পাশাপাশি এটি নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের ইনফেকশন এবং অন্ধত্বের মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
- টিকার কার্যকারিতা: টিকাদানের মাধ্যমে খুব সহজেই শিশু শরীর এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকার
বক্তব্যের শেষভাগে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত বলেন, স্বাস্থ্যের সুরক্ষা পাওয়া জনগণের মৌলিক অধিকার এবং এটি সরকারের একটি বড় অঙ্গীকার। যত বাধাই আসুক না কেন, সরকার দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাহায্যে স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করবে।
আগামী এক মাসের মধ্যে বাকি ৩৫ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় এনে দেশকে হাম ও রুবেলা মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।




