বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার দিন এখন অতীত। বর্তমানে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিআরটিএ তাদের বেশিরভাগ সেবাই ডিজিটাল বা অনলাইনভিত্তিক করে ফেলেছে। এখন আপনি ঘরে বসেই লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন, ফি জমা দেওয়া, এমনকি পরীক্ষার ফলাফলও দেখতে পারবেন।
তবে মনে রাখা জরুরি, আবেদন ও ফি জমার কাজ অনলাইনে হলেও লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আপনাকে নির্ধারিত দিনে বিআরটিএ কেন্দ্রে গিয়ে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতেই হবে। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে আবেদনের আগেই যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি ও পরীক্ষার সঠিক নিয়ম জেনে রাখা খুবই দরকার।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা
অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার আগে আপনাকে কয়েকটি মৌলিক শর্ত বা যোগ্যতা পূরণ করতে হবে:
- বয়স সীমা: অপেশাদার (Non-Professional) ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীর বয়স সর্বনিম্ন ১৮ বছর হতে হবে। তবে পেশাদার (Professional) ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স হতে হবে ২১ বছর।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: আবেদনকারীকে অন্তত অষ্টম শ্রেণি বা তার সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
- শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা: লাইসেন্স পাওয়ার জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা আবশ্যক, যা অনুমোদিত ডাক্তারের মাধ্যমে মেডিকেল সনদের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
আবেদনের পূর্বে যেসব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন
অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফরম পূরণ করার সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক সাইজ ও ফরম্যাটে স্ক্যান করে আপলোড করতে হয়। তাই আবেদন শুরু করার আগেই নিচের ফাইলগুলো প্রস্তুত রাখুন:
১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): আবেদনকারীর এনআইডির স্পষ্ট স্ক্যান কপি।
২. মেডিকেল সার্টিফিকেট: রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দ্বারা প্রদত্ত বিআরটিএ নির্ধারিত ফর্মের শারীরিক সুস্থতার সনদ।
৩. ছবি: সম্প্রতি তোলা রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
৪. শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: অন্তত অষ্টম শ্রেণি পাস বা সমমানের বোর্ড সনদের স্ক্যান কপি।
৫. ঠিকানার প্রমাণপত্র: আপনার বর্তমান ঠিকানা যদি জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ঠিকানার সাথে না মিলে, তবে বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে সাম্প্রতিক ইউটিলিটি বিলের (বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানি) কপি জমা দিতে হবে।
সতর্কতা: অস্পষ্ট ছবি বা ভুল নথি আপলোড করলে আপনার আবেদন বাতিল বা স্থগিত হয়ে যেতে পারে।
বিআরটিএ সেবা পোর্টাল (BSP) এবং অনলাইনে লার্নার লাইসেন্স আবেদনের ধাপসমূহ
বিআরটিএর সব ধরণের সেবা নিতে তাদের অফিসিয়াল পোর্টাল bsp.brta.gov.bd ব্যবহার করতে হবে। নিচে অনলাইন লার্নার বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স আবেদনের প্রতিটি ধাপ সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো:
১. পোর্টালে একাউন্ট তৈরি ও নিবন্ধন
প্রথমেই বিআরটিএ সেবা পোর্টালে প্রবেশ করে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি (Sign Up) করে নিতে হবে। নিবন্ধনের সময় আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ এবং একটি সক্রিয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতে হবে।
২. প্রোফাইল হালনাগাদ
অ্যাকাউন্টে লগইন করার পর আপনার নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে।
৩. আবেদন ফরম পূরণ
ড্যাশবোর্ড থেকে ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স’ মেনুতে গিয়ে ‘শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের জন্য আবেদন’ নির্বাচন করুন। এরপর আপনি কোন ক্যাটাগরির লাইসেন্স চান (যেমন: হালকা যান, মোটরসাইকেল ইত্যাদি) তা সঠিকভাবে সিলেক্ট করুন।
৪. কাগজপত্র স্ক্যান ও আপলোড
নির্ধারিত অপশনে আপনার পূর্বপ্রস্তুতকৃত ছবি, মেডিকেল সার্টিফিকেট, এনআইডি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সঠিক ফাইলের আকার অনুযায়ী আপলোড করুন।
৫. ফি পরিশোধ
আবেদন সম্পন্ন হলে স্ক্রিনে ধার্যকৃত ফি দেখা যাবে। বিআরটিএর অনুমোদিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের (বিকাশ, নগদ, রকেট, কার্ড বা নেট ব্যাংকিং) মাধ্যমে ফি জমা দিয়ে দিন।
৬. লার্নার লাইসেন্স ডাউনলোড
পেমেন্ট সফল হলে বিআরটিএ পোর্টাল থেকে সাথে সাথেই আপনার শিক্ষানবিশ/লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সটি ই-পেপার হিসেবে ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে নিতে পারবেন। এই লাইসেন্সেই আপনার পরীক্ষার তারিখ ও কেন্দ্রের নাম দেওয়া থাকবে।
প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও ফলাফল জানার পদ্ধতি
লার্নার লাইসেন্স হাতে পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। লার্নার কার্ডে নির্ধারিত তারিখে আপনাকে নির্দিষ্ট বিআরটিএ পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষায় বসতে হবে।
- পরীক্ষার ধরন: পরীক্ষা মূলত তিনটি ধাপে হয়ে থাকে লিখিত, মৌখিক এবং ব্যবহারিক (ড্রাইভিং দক্ষতা)।
- পরীক্ষার দিন প্রয়োজনীয় জিনিস: পরীক্ষার দিন লার্নার লাইসেন্সের প্রিন্ট কপি, এনআইডির মূল কপি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঙ্গে রাখতে হবে।
- ফলাফল দেখা: পরীক্ষা শেষে বিআরটিএ সেবা পোর্টালে লগইন করেই আপনি লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার ফলাফল জানতে পারবেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আপনি স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার যোগ্য হবেন।
স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার উপায়
পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরবর্তী ধাপ হলো ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া।
১. বিআরটিএ পোর্টালে আপনার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।
২. ‘স্মার্ট কার্ড লাইসেন্সের জন্য আবেদন’ অপশনে ক্লিক করুন।
৩. পেশাদার লাইসেন্স হলে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কাগজপত্র (যেমন: ডোপ টেস্ট রিপোর্ট) আপলোড করতে হবে।
৪. নির্ধারিত স্মার্ট কার্ডের ফি অনলাইনে পরিশোধ করুন।
৫. ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স ডাউনলোড করুন। স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত হলে বিআরটিএ থেকে আপনার মোবাইলে এসএমএস (SMS) পাঠানো হবে। আপনার দেওয়া ঠিকানায় ডাকযোগে বা বিআরটিএ অফিস থেকে লাইসেন্স কার্ড সংগ্রহ করা যাবে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে? (ফি ও খরচের হিসাব)
বিআরটিএর নির্ধারিত ফি অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স করার খরচ নিচে দেওয়া হলো:
- লার্নার লাইসেন্স ফি: একটি মাত্র ক্যাটাগরির (যেমন শুধু মোটরসাইকেল বা শুধু গাড়ি) জন্য ৫১৮ টাকা। তবে দুইটি ক্যাটাগরি (মোটরসাইকেল ও হালকা মোটরযান একসাথে) হলে ৭৪৮ টাকা।
- অপেশাদার স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স (১০ বছর মেয়াদ): ৪,৪৯৭ টাকা।
- পেশাদার স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স (৫ বছর মেয়াদ): ২,৭৭২ টাকা।
- ডেলিভারি চার্জ (ডাকযোগে বাড়ি পৌঁছানো): অতিরিক্ত ৬০ টাকা।
(দ্রষ্টব্য: সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফি পরিবর্তিত হতে পারে এবং অনলাইন পেমেন্ট চার্জ কিছুটা যুক্ত হতে পারে। তাই ফি পরিশোধের আগে পোর্টালে ফি ক্যালকুলেটর থেকে বর্তমান ফি দেখে নেওয়া ভালো।)
আবেদনের বর্তমান অবস্থা ও লাইসেন্স যাচাই করবেন যেভাবে
আপনি বিআরটিএ সেবা পোর্টালে লগইন করেই সরাসরি দেখতে পারবেন আপনার আবেদনের ফাইলটি বর্তমানে কোন ধাপে রয়েছে। এছাড়া আপনার স্মার্ট কার্ড লাইসেন্সের বৈধতা যাচাই করার জন্য বিআরটিএর নির্ধারিত মোবাইল অ্যাপ বা পোর্টালে থাকা অনলাইন ভেরিফিকেশন সিস্টেম ব্যবহার করা যায়।
অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদনের ক্ষেত্রে জরুরি সতর্কতা
ঘরে বসে নিজে নিজে আবেদন করার সময় ভুলত্রুটি এড়াতে এই বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ নজর দিন:
- তথ্য মেলাণ: আপনার এনআইডি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের নাম, পিতার নাম, জন্মতারিখ যেন আবেদনের তথ্যের সাথে শতভাগ মিলে যায়।
- নথি স্পষ্ট হওয়া: ছবি বা এনআইডির স্ক্যান কপি যেন অস্পষ্ট বা ঝাপসা না হয়।
- দালাল চক্র থেকে দূরে থাকুন: বিআরটিএর প্রক্রিয়া এখন অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। তাই অসাধু দালালদের ফাঁদে না পড়ে নিজে নিজে কিংবা বিশ্বস্ত কারও সাহায্য নিয়ে সরাসরি সরকারি পোর্টাল (bsp.brta.gov.bd) ব্যবহার করুন।
আজই প্রয়োজনীয় নথি গুছিয়ে বিআরটিএর পোর্টালে প্রবেশ করুন এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সাহায্য ছাড়াই ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করে নিন।




